ঢাকা: বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ব্যবহৃত ফ্রেইট সেবার বড় অংশ এখনো বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর ফ্রেইট বাবদ পরিশোধ করা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশীয় পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো গেলে বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার দেশে রাখা সম্ভব বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক রিসার্চ’ (সিএসআর)।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সিএসআর আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার ফ্রেইট ব্যয় করে। এর মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিপরীতে ফ্রেইট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন জাহাজ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সক্ষমতা ২০ শতাংশ বাড়ানো গেলে বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার দেশে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের পতাকাবাহী (মার্চেন্ট) জাহাজ আইন, ২০১৯ কার্যকর হওয়ার পর দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ২০১৯ সালের ৪৮টি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ৮০টিতে উন্নীত হয়। এতে দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব জাহাজের আয়ও দেশে থেকে যায়।
সিএসআরের গবেষণায় বিদ্যমান নীতিমালার পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ২০১৫ সালের বিধি অনুযায়ী যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে দেশীয় অংশীদারিত্ব ৫১ শতাংশ এবং বিদেশি অংশীদারিত্ব ৪৯ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে এর যথাযথ প্রয়োগ নেই বলে দাবি করা হয়। গবেষণায় দেশীয় মালিকানা ৬০ শতাংশ এবং বিদেশি মালিকানা ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। বিদেশি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধিত মূলধন বাধ্যতামূলক করা এবং এর একটি অংশ প্রকৃত প্রযুক্তি, কারিগরি সরঞ্জাম ও অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বিদেশি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও দেশীয় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে নওগাঁ থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বলেন, লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানার উচ্চ উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, মাত্র কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান খাতটির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)-এর সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, দেশের ফ্রেইট ব্যবসার প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। অথচ তারা উল্লেখযোগ্য প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে আসে না। বাফার বর্তমান সভাপতিও এ বিষয়ে একই ধরনের মত প্রকাশ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সব খাতে বিদেশি অংশগ্রহণের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। অন্যথায় দেশীয় উদ্যোক্তারা আরও পিছিয়ে পড়তে পারেন।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি অংশগ্রহণ দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এ টি এম আজিজুল হক ডেভিড বলেন, দেশে উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর সুযোগ নিচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফা কে. মুজেরী, সাবেক সচিব আলম মো. শহীদ খান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহমুদ এবং গণমাধ্যম ও ব্যবসায়িক খাতের প্রতিনিধিরা।