Sunday 02 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

১৭ লাখ টাকায় পুলিশের চাকরি, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাসহ গ্রেফতার ৪

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২ আগস্ট ২০২৬ ১১:০১

রংপুর: রংপুরে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) (নিরস্ত্র) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি ও প্রক্সি দেওয়ার ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মো. বাদশা মাসউদ আলমসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে দালাল, পরীক্ষার্থী ও প্রক্সি পরীক্ষার্থীও রয়েছেন।

রোববার (২ আগস্ট) গ্রেফতার চারজনকে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করা হলে মামলা রুজু করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনাটি মূলত গত শুক্রবার (৩০ জুলাই) এসআই পরীক্ষার দিনই নজরে আসে। পরীক্ষাকেন্দ্রে ফেস ডিটেকশনে সন্দেহভাজন একজন পরীক্ষার্থীকে আটকের পরই পুরো চক্রের খোঁজ মেলে। পুলিশ বলছে, চক্রটি ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে পুলিশে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করছিল। এখন পর্যন্ত আড়াই লাখ টাকা হাতবদল হওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার বিকেলে রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরীক্ষাকেন্দ্রের মূল ফটকে ফেস ডিটেকশন পয়েন্টে চেকের সময় আশরাফুল ইসলাম (২১) নামের এক পরীক্ষার্থীকে সন্দেহ হয় গোয়েন্দা পুলিশের। তাকে আটক করে ভেতরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি স্বীকার করেন— তার কাছে থাকা প্রবেশপত্রটি জাল এবং তার হয়ে আসল পরীক্ষা দিতে এসেছেন তাজমিলুর রহমান (১৯)। পরক্ষণেই তাজমিলুরকেও আটক করা হয়।

আশরাফুলের স্বীকারোক্তিতেই বেরিয়ে আসে বড় চক্রের হদিস। তিনি জানান, তার বাবার সঙ্গে ১৭ লাখ টাকায় চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চুক্তি হয় বাদশা মাসউদ আলম ও নুরুল ইসলাম-এর মাধ্যমে। চুক্তি অনুযায়ী তিনি দিনাজপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের একটি হিসাবে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন এবং হোয়াটসঅ্যাপে জাল প্রবেশপত্র পেয়েছেন। অথচ তিনি নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষায় অংশই নেননি— তা সত্ত্বেও তাকে পরীক্ষায় বসতে বলা হয়।

ওই তথ্যের ভিত্তিতেই রংপুর নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে বাদশা মাসউদ আলমকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তার মোবাইল ফোনে উদ্ধার হয় প্রতারণা, অর্থ লেনদেন ও জাল প্রবেশপত্র তৈরির সাথে সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য-প্রমাণ। পরে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আরেক সদস্য নুরুল ইসলাম-কেও গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের ক্যাডেট এএসআই পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে প্রতারণা করছিল। তারা শুধু জাল প্রবেশপত্র তৈরিই নয়, বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করত বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশে এএসআই পদে প্রায় ৪ হাজার জনের বেশি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, যেখানে লাখ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে অনেকে প্রতারকচক্রের সহজ শিকার হচ্ছেন— বিশেষ করে যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল কিন্তু শারীরিক বা লিখিত পরীক্ষায় অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তাদের টার্গেট করে এসব চক্র সক্রিয় হয় বলে পুলিশ মনে করছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও প্রতিযোগিতার চাপ এ ধরনের প্রতারণার সুযোগ তৈরি করছে। পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক স্পষ্ট করেছেন, ‘পুলিশের যেকোনো নিয়োগে অনিয়ম, জালিয়াতি বা দালাল চক্রের কোনো স্থান নেই। যারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল কাদের জানান, গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে এবং তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত আরও ২-৩ জনের সন্ধান মিলেছে— তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া, পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এই ঘটনায় জাল প্রবেশপত্র কারা তৈরি করেছে, ব্যাংক হিসাবের সম্পূর্ণ লেনদেনের ধারা, এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহারের বিষয়টি— সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা টাকা দিয়েছিলেন, তারাও আইনের আওতায় আসতে পারেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কারণ জালিয়াতির সহায়তা বা চুক্তি করাও দণ্ডনীয় অপরাধ।

পুলিশের পক্ষ থেকে চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রতি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে— কোনো ব্যক্তি বা চক্র যদি অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট থানা বা গোয়েন্দা শাখাকে জানাতে হবে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, ‘কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় টাকার বিনিময়ে পাস করানোর ব্যবস্থা নেই।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর