Tuesday 04 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

৮ শতাংশ সুদে আদায় হবে ২৪ শতাংশ / স্বল্প সুদের কৃষি ঋণের ফায়দা লুটতে সক্রিয় হচ্ছে এজেন্টরা

আদিল খান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ আগস্ট ২০২৬ ১৮:২৪ | আপডেট: ৩ আগস্ট ২০২৬ ১৯:০৬

– কোলাজ প্রতীকী ছবি : সারাবাংলা

ঢাকা: দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করতে যাচ্ছে। স্কিমটির আওতায় ঋণ বিতরণে ইতোমধ্যে ৪২টি ব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা কৃষকের কাছে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। কিন্তু এজন্টেরা থাবা দিয়ে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত আদায় করবে এমন সুযোগ রাখা হয়েছে। সেজন্য এ ঋণ বিতরণের কাজ ভাগিয়ে নিতে একের পর এক ফন্দির ছক কষছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কলকাঠি নাড়ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিকি ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, স্কিমটির মূল লক্ষ্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পল্লী অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই উদ্যোগ চালুর আগেই এর নীতিমালার একটি পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি ঋণ বিতরণে ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্কের পাশাপাশি ‘এজেন্ট কোম্পানি’ বা ‘ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান’ যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এর ফলে কৃষকের জন্য ঘোষিত ৮ শতাংশ সুদের ঋণ বাস্তবে ২৪ শতাংশ, এমনকি তারও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র জানায়, নীতিমালায় এজেন্ট বা ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার সুযোগ রাখার ফলে কৃষকের সঙ্গে ব্যাংকের সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। ঋণ পাওয়ার জন্য কৃষককে প্রথমে এজেন্টের কাছে যেতে হবে, এরপর ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ধরনের কমিশন, অবৈধ অর্থ লেনদেন বা তথাকথিত ‘চা-খাওয়ার টাকা’ প্রচলিত হয়, তাহলে ঘোষিত ৮ শতাংশ সুদের ঋণের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে গ্রামের বাস্তবতায় সরকারি কিংবা আর্থিক সেবা পেতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়। কৃষকদের আশঙ্কা, যদি এজেন্ট ও ব্যাংক—দুই স্তরেই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে কাগজে ৮ শতাংশ সুদের ঋণ বাস্তবে ২৪ শতাংশ কিংবা তারও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। তখন স্বল্পসুদের কৃষি ঋণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। যদিও
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাতে সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ঘোষিত ৮ শতাংশ সুদের ঋণ যেন প্রকৃত অর্থেই ৮ শতাংশ সুদে কৃষকের হাতে পৌঁছায়। কোনো এজেন্ট, মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের কারণে যদি এই ঋণের কার্যকর ব্যয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছে যায়, তাহলে ১০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে নতুন ধরনের ঋণ-ফাঁদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই স্কিমটি চালুর আগে বিতর্কিত বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা এবং কঠোর তদারকির বিকল্প নেই।

সূত্র জানায়, প্রথমদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়নে পাঁচ বছরের জন্য এই স্কিম চালুর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নতুন টাকা সৃষ্টি করে এই অর্থায়ন করত, তাহলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারত। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। সেই বিবেচনায় নিজস্ব অর্থায়নের পরিবর্তে তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্কিমটির মেয়াদও পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। একজন কৃষক বা গ্রাহক সর্বোচ্চ তিনবার এই সুবিধা পাবেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় গঠিত তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নেবে এবং কৃষকদের কাছে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। কৃষির ধরণ অনুযায়ী তিন মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড থাকবে এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কাগজে-কলমে এটি কৃষকের জন্য একটি আকর্ষণীয় উদ্যোগ। কারণ বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক এখনো এনজিও, মহাজন কিংবা বেসরকারি উৎস থেকে অনেক বেশি ব্যয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হন। সেখানে ৮ শতাংশ সুদের ব্যাংক ঋণ কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তি হওয়ার কথা। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিভাগ চুক্তির খসড়ার লিগ্যাল ভেটিংও শেষ করেছে।

বাংলা‌দেশ ব্যাং‌কের মুখপাত্র আরিফ হো‌সেন খান বিষয়‌টি অস্বীকার ক‌রে ব‌লেন, আমরা এর আগেও এজেন্টের মাধ্যমে ঋণ দি‌য়ে‌ছি। ‌সেখা‌নে এ রকম কিছু ঘ‌টে‌নি। আর কিছু কিছু ব্যাংকের নেটওয়ার্ক গ্রাম অঞ্চলে নেই। তাই এজে‌ন্টের মাধ্যমে দেওয়া হ‌বে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে। এরপরই শুরু হবে বহুর প্রতীক্ষিত এই কৃষি ঋণ কর্মসূচি।

কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কৃষি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থের অভাব নয়, বরং অর্থ প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানো। অতীতেও বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি, ভুয়া উদ্যোক্তা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিয়েছেন; অথচ প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। নতুন স্কিমেও যদি সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে ১০ হাজার কোটি টাকার এ তহবিল কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

অবশ্য ব্যাংকগুলোর একটি অংশ বলছে, দেশের সব ইউনিয়ন বা প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকের নিজস্ব শাখা নেই। এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজেন্ট ব্যবহার করতেই হলে তাদের ভূমিকা, কমিশন, দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অবস্থাতেই কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে তহবিল বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে—ব্যাংকের চাহিদা, কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সক্ষমতা। অর্থাৎ সব ব্যাংক সমান পরিমাণ অর্থ পাবে না। যেসব ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিতরণে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বেশি, তারা তুলনামূলক বেশি তহবিল পেতে পারে।

তবে শুধু ব্যাংক নির্বাচন করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আবেদন থেকে ঋণ অনুমোদন, বিতরণ এবং পরিশোধ—সব তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, কোথাও কোনো এজেন্ট বা ব্যাংক কর্মকর্তা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন কি না।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর