ঢাকা: দেশের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬) একদিকে ঋণ বিতরণ বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে খেলাপি ঋণের হার। একই সঙ্গে কমেছে মোট ঋণের স্থিতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে আরও পিছিয়ে পড়েছে এই খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে সিএমএসএমই খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। দেশের মোট ঋণের মধ্যে এই খাতের অংশ এখন ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ, অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে খাতটি।
অন্যদিকে, জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে সিএমএসএমই খাতে ৫২ হাজার ১০৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। একই সময়ে ঋণ পেয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫৩টি প্রতিষ্ঠান, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ নতুন ঋণ বিতরণ বাড়লেও পুরোনো ঋণ আদায় ও স্থিতির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি। মার্চ শেষে সিএমএসএমই খাতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে ছিল ২৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ দশমিক ০১ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ঋণমানের অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত এবং আদায় কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ব্যাংকভেদে খেলাপি ঋণের চিত্র আরও বৈচিত্র্যময়। ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ফাইন্যান্স কোম্পানিতে ২৩ দশমিক ০৬ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ২২ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
মোট সিএমএসএমই ঋণের ৫১ দশমিক ৯৫ শতাংশ রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে। ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশ ২০ দশমিক ০৮ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর বাকি অংশ বিশেষায়িত ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত।
প্রথম প্রান্তিকে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যারা একাই ৭ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এরপর রয়েছে পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচটি ব্যাংক মিলে মোট বিতরণের প্রায় ৪০ শতাংশ ঋণ দিয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের অংশ কিছুটা বাড়লেও তা এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম। মার্চ শেষে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, যা মোট সিএমএসএমই ঋণের ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ নিয়ন্ত্রকের লক্ষ্য ১৫ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮ জন নারী উদ্যোক্তা প্রায় ৪ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট সিএমএসএমই ঋণের ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ গেছে বাণিজ্য খাতে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ সীমা ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে উৎপাদন খাত পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা নির্ধারিত ন্যূনতম ৪০ শতাংশের নিচে। সেবা খাতের অংশ ২০ দশমিক ১১ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে।
মার্চ শেষে জামানতবিহীন সিএমএসএমই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা, যা মোট পোর্টফোলিওর ১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ঋণের অংশ ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ, নতুন উদ্যোক্তাদের অংশ ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে এসব সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে।
বিকল্প বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণেও অগ্রগতি দেখা গেছে। এমএফআই সংযোগের মাধ্যমে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৭টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। এর ৮৩ শতাংশের বেশি উপকারভোগী নারী উদ্যোক্তা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরও ৯৮৮টি প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা মোট সিএমএসএমই ঋণের ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য ১০ শতাংশ। কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তৈরি পোশাক খাত মিলেই ক্লাস্টার ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পেয়েছে।
খাতটিকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার FSFDMSME, ৩ হাজার কোটি টাকার ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং স্কিম, ১৮ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ একাধিক নতুন ও পুনর্গঠিত তহবিল চালু করেছে। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তা, নতুন উদ্যোক্তা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আকারও বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নারী উদ্যোক্তা, জামানতবিহীন ঋণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অগ্রগতি হলেও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি, ক্লাস্টার ঋণ সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক সিএমএসএমই পোর্টফোলিও শক্তিশালী করতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।