ঢাকা: বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবগুলো এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে বিএনপি-কে হাত পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সিজিএস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর গবেষণা প্রকল্প “রিফর্ম ওয়াচ” উদ্যোগের আওতায় জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে প্রস্তুত মধ্যবর্তী প্রতিবেদনের ফলাফল উপস্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে “সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়” শীর্ষক একটি সংলাপ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন- বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম, বিএনপির সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলেরর সাধারণ সম্পাদক (জাসদ) নাজমুল হক প্রধান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সদস্য লামিয়া ইসলাম, খেলাফত মজলিস-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া, ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য তাসমিয়া প্রধান, ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের ধারণা অনেক সময় এমন থাকে যে, সবকিছু একসঙ্গে হয়ে যাবে। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্র মূলত একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি ও ধারাবাহিক চর্চার বিষয়। নিঃসন্দেহে একটি ভালো নির্বাচন হয়েছে, তবে দীর্ঘদিন পর অনেকেই এটিকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলে মনে না-ও করতে পারেন।
শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ১৬টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, তবে সবগুলোই বিএনপির দেওয়া নয়। বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবগুলো এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে বিএনপিকে হাত পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দেয়া হয়েছে। তার মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীদের আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ৫০টি সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি আরও ৫০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে; এর বাইরে বাস্তবসম্মত কোনো পথ নেই। দীর্ঘদিনের নির্যাতনের মধ্যেও তাদের নেতারা কর্মসূচি জারি রেখেছেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করাই জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন হবে।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা, বেকারত্ব ও বৈষম্য বেড়েছে, যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা জরুরি। ৫ আগস্টের পর আরও পরিণত রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা, আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের পর মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত এবং একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে; এই প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা হলে মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, জুলাইয়ের চেতনার আলোকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার করতে হবে এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পুলিশের পুরোনো দমনমূলক মানসিকতা পরিবর্তন করে তদন্ত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।
ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কারের একটি বড় সুযোগ তৈরি হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে সেই ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। জুলাই সনদের উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিবাচক হলেও এর সূচনাপ্রক্রিয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, সংসদের বিদ্যমান কমিটিগুলো সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিল আকারে পাস করতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কমিশন ও বিচারক নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিশেষ করে পুলিশ সংস্কার জরুরি; পুলিশকে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও দুর্বল হবে।
রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে কার্যকর ভূমিকা ও সংসদের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রকৃত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্থানীয় সরকারকে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত করাও জরুরি। গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে হবে।
নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে সহনশীল রাজনীতির চর্চা গড়ে ওঠেনি; ক্ষমতার পরিবর্তন বারবার সংঘাতের মধ্য দিয়ে হয়েছে। সরকার পরিবর্তিত হলেও কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসেনি। তিনি আরও বলেন, সহনশীল মানসিকতা ছাড়া গণতন্ত্র এগোতে পারে না। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র সংকটে থাকলেও বাংলাদেশ একটি ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারত। তাই সংসদকে আরও কার্যকর করে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, রাষ্ট্রে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে আমলাতন্ত্রের সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই সনদে নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের গণতান্ত্রিক চাহিদা এবং নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল হলে অপশক্তি ফিরে আসতে পারে; তাই শুধু আলোচনা নয়, জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, গণতন্ত্রকে নিয়মিত চর্চার মধ্যে রাখতে হবে এবং জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচার বিভাগ, পুলিশ ও গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কার্যকর সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।
জলি তালুকদার বলেন, জুলাইয়ের সংস্কারকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। নারীদের বাস্তব রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।
লামিয়া ইসলাম বলেন বাংলাদেশের সংকটের সময়ে নারীরা সবসময় সামনের সারিতে থেকেছেন, তাই নীতিনির্ধারণেও তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে আইন ও সংবিধানের হালনাগাদ প্রয়োজন। ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ এবং কার্যকর সংস্কার জরুরি।
অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম বলেন,পুলিশ প্রশাসনের ঔপনিবেশিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং প্রার্থীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।
সোহরাব হাসান বলেন মৌলিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে নিতে হবে। স্থানীয় সরকার ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমান সুযোগ, মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণেও রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন , সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার অংশগ্রহণমূলক হওয়া প্রয়োজন। সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলালে পুরোনো ব্যবস্থাই বহাল থাকবে।
তাসমিয়া প্রধান বলেন,গণঅভ্যুত্থানের পর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু না হওয়া হতাশাজনক; প্রকৃত সংস্কার হলে নারীর অংশগ্রহণও বাড়বে।
সাবিকুন্নাহার মুন্নী বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি নারীদের নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ড. বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, সংস্কারের জন্য স্পষ্ট অগ্রাধিকারভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। রাজনৈতিকীকরণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে জবাবদিহি, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
সারোয়ার তুষার বলেন গণভোট ও সংস্কার নিয়ে নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থানের বৈপরীত্য জনগণকে হতাশ করতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।