ঢাকা: মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তা কমিয়ে সহাবস্থানে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বুধবার (১২ আগস্ট) আগারগাঁওয়ের বন অধিদফতরের হৈমন্তি মিলনায়তনে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এই কথা বলেন। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিশ্ব জুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, হাতি সংরক্ষণ আমাদের সবার জন্য একটি নৈতিক কর্তব্য। মানুষ এবং হাতির দ্বন্দ্ব পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব না হলেও এটিকে কমিয়ে এনে একটি সহাবস্থানে আনা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো কৃষকের ধানখেত হাতি নষ্ট করলে তাকে সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, কিন্তু সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আরও দ্রুত ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির ক্ষেত্রে বিমার সুযোগ করা যায় কি না, সেটিও বন অধিদপ্তরকে খতিয়ে দেখতে হবে ।
বনমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতির সংখ্যা ২৬৮টি, পরিযায়ী বন্য হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতির সংখ্যা ৯৬টি। বন উজাড়, বনের মধ্য দিয়ে রাস্তা, রেললাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী অপরাধের কারণে হাতি নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এতে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ-হাতি সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং জানমালের ক্ষতির জন্য নির্দিষ্ট হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণে নিহত ৩২২ জনের পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও পশুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বিতরণ করা হয়েছে। হাতি অধ্যুষিত এলাকায় এ পর্যন্ত ১৬০টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম বা ইআরটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে প্রায় ১০ জন সদস্য রয়েছেন। ফসলের জমি কিংবা লোকালয়ে হাতির আগমন সম্পর্কে সতর্কতা দেওয়া, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ উপায়ে মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে এই দলগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাতির খাদ্য ও আবাসস্থল উন্নয়নে এ পর্যন্ত হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ৩ হাজার ২৪৮ হেক্টর বাগান তৈরি করা হয়েছে এবং বনায়ন কার্যক্রমে এই ধরনের বৃক্ষের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত ।
বন্যপ্রাণী অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার কথা জানিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার, পাচার ও অবৈধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। হাতি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। পোষা বা ক্যাপটিভ হাতির কল্যাণের ওপরও গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, হাতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ায় তাদের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক আচরণ ও প্রয়োজনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে হাতি সংরক্ষণকে শুধু সরকারের দায়িত্ব না দেখে সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু সরকারের একক উদ্যোগে এটি যথেষ্ট নয়। বন বিভাগের মাঠকর্মী, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। হাতির আবাসস্থল রক্ষা মানে শুধু হাতিদের রক্ষা করা নয়, এর মাধ্যমে আমাদের প্রতিবেশ, পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্য এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ, সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী।