রংপুর: প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু-বৃদ্ধ, রোগী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এক সপ্তাহ ধরে রংপুরের তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আকাশে মেঘ না থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্র জানায়, চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে তারা। রংপুর শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গতকাল রাতে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় গড়ে অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতায় প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন ১১০-১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭০-৮০ মেগাওয়াট। অপরদিকে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন ৬০ মেগাওয়াট। উত্তরাঞ্চলের ১৭টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় এক কোটি গ্রাহক একই সংকটে পড়েছেন।
শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গ্রামে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না। রাতের ১২ ঘণ্টায় মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
পায়রাবন্দ গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এমনিতেই প্রচণ্ড গরম। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্ট হচ্ছে। আধা ঘণ্টা থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না বিদ্যুৎ। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টায় হয়তো ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।’
গঙ্গাচড়ার কৃষক সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘রাত বিদ্যুৎ না থাকলে কী ঘুম হয়। তার ওপর প্রচণ্ড গরম। দিনে-রাতে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।’
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ডায়রিয়া রোগী মিল্লাত হাসান বলেন, ‘অসহ্য গরমের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ওয়ার্ডে থাকা খুব কষ্টকর। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুমানো যায় না। অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।’
ব্যবসায়ী শমসের আলী জানান, বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসার কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আয়-রোজগার কমে গেছে। কর্মচারীদের বেতন ও দোকান ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
মিঠাপুকুরের কম্পিউটার দোকানদার শাহিন মন্ডল বলেন, ‘দিন-রাতে প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কম্পিউটার, ফটোকপি ও ইন্টারনেটনির্ভর সেবা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।’
হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একজন রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, ‘হাসপাতালে রোগীরা এমনিতেই কষ্টে থাকেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে তাদের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অন্তত হাসপাতালের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।’
বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তালুক হাবু গ্রামের আহাদ আলী জানান, গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন ১০-১২ বার লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ফ্রিজসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘লোডশেডিং শুধু রংপুরেই নয়, এ সমস্যা সারাদেশব্যাপী। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে খুব দ্রুত লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি।’
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জিএম মনোয়ারুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। লাইনের ত্রুটিও দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে।
তবে ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং লোডশেডিং কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সূচি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যাতে মানুষ আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেন।