ঢাকা: দেশে গত ১৭ বছর গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু আমদানি নির্ভরতা বাড়ানোর কারণে বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে- বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাঠামোগত দুর্বলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতিকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, শুধু আমদানি করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এ জন্য দ্রুত নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে জ্বালানি সংকট চলছে। সম্প্রতি দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেন তাঁরা।
আলোচকেরা বলেন, জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সংকট আরও গভীর হয়েছে। দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নতুন নতুন কূপ খনন করতে হবে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের শিল্প খাত। এমনকি গ্যাসের অভাবে অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সেমিনারে বক্তারা আরও বলেন, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি।
বর্তমান জ্বালানি সংকট প্রকট হওয়ার পেছনে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের নীতির সমালোচনা করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তার অভিযোগ, গত ১৭ বছরে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং আমদানিনির্ভরতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এর ফলেই এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সংকট কমাতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ জন্য নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। আমদানির পাশাপাশি দেশের গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন সেমিনারের আলোচকেরা। তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে।