ঢাকা: অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা যাচাইয়ে ‘এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং’ (এপিজি)–এর‘ প্রি-মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্ল্যানিং’ (P-MEP) সফর শেষ হয়েছে। তিন দিনের এই সফরে বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এবং পাচার করা অর্থ-সম্পদ উদ্ধারে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে এপিজির প্রতিনিধিদল।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১১ থেকে ১৩ আগস্ট এপিজির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
এপিজি হলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধব্যবস্থা মূল্যায়নের একটি আঞ্চলিক সংস্থা। সংস্থাটি সদস্যদেশগুলোর আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পাশাপাশি বাস্তবে এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করে।
বাংলাদেশের জন্য এবারের P-MEP সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এর পরবর্তী ধাপে ২০২৭-২৮ মেয়াদে এপিজির চতুর্থ দফার মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন হওয়ার কথা রয়েছে। সেই মূল্যায়নে দেশের অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের আইনগত কাঠামোর পাশাপাশি বাস্তবে কতটা কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে শুধু আইন ও বিধিমালা থাকলেই হবে না; সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার পর তদন্ত, মামলা, বিচার, দণ্ড এবং অপরাধের অর্থ বা সম্পদ চিহ্নিত, জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও শেষ পর্যন্ত উদ্ধারের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এপিজির মূল্যায়নে এসব কার্যকারিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এপিজির চতুর্থ দফার মূল্যায়ন সামনে রেখে বাংলাদেশ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ করছে। এগুলো হলো—মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, গণবিধ্বংসী অস্ত্র বিস্তারে অর্থায়ন, এনজিও ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকি এবং ভার্চুয়াল সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি।
এসব ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণের কাজও চলছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিজ নিজ ক্ষেত্রের ঝুঁকি মূল্যায়নে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নের বড় অংশের কাজ ইতিমধ্যে এগিয়েছে এবং চলতি বছরের মধ্যে তা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রস্তুতিতে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ সংযুক্ত ও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা এবং বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ রয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে অগ্রাধিকার পাওয়া ১১টি মামলার তদন্ত ও অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব মামলায় দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া এবং মামলা নিষ্পত্তির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্পদ জব্দ করা গেলেই অর্থ পাচার প্রতিরোধের কার্যকারিতা প্রমাণ হয় না। পাচার করা অর্থের উৎস ও গতিপথ শনাক্ত করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার সম্পন্ন করা এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতাই হবে বড় পরীক্ষা।
এপিজি’র মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু মানি লন্ডারিং প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়নে দুর্বল অবস্থান তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বৈদেশিক বাণিজ্য, রেমিট্যান্স ও বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেভাগেই প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
বাংলাদেশের আগের এপিজি মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট ২০১৬ সালে গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তী মূল্যায়নের আগে আইন ও বিধিমালার সংস্কার, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এবং সম্পদ উদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিন দিনের P-MEP সফরে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণে বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান, অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। এপিজির প্রতিনিধিদলের এই সফরকে আগামী দিনের পূর্ণাঙ্গ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।