ঢাকা: সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দেশে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সম্ভাব্য এই বিনিয়োগের পাশাপাশি আমিরাতে বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা নিরসন এবং ভিসা বাতিল হয়ে দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের দ্রুত আমিরাতে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী এনআরবি সিআইপি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা আজ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রবাসীদের সমস্যা, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রবাসী ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে তাঁদের সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রধান খাত হবে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকিং, ড্রাই ফুড প্রসেসিং ও প্যাকেজিং, ই-রেন্টাল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা।
প্রবাসী ব্যবসায়ীদের মতে, সরকার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সহজ অনুমোদন, জমি বা লিজ সুবিধা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করলে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এতে দেশে নতুন শিল্প গড়ে ওঠার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে বৈঠক করবেন বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। ওই বৈঠকে বিনিয়োগের খাত, বিনিয়োগের পরিবেশ, সরকারি সহায়তা এবং দ্রুত অনুমোদনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আমিরাতপ্রবাসীরা বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ভিসা জটিলতার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে প্রায় ১২ বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের অভ্যন্তরীণভাবে মালিক পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় অনেক কর্মী কর্মসংস্থান ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের মালিক পরিবর্তনের সুযোগ পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা বাতিলের কারণে হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসী দেশে আটকে পড়েছেন বলে জানান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তাদের অনেকের চাকরি, ব্যবসা ও পরিবার আমিরাতে রয়েছে। তাই দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের তালিকা তৈরি করে আমিরাত সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং তাঁদের পুনরায় দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
প্রবাসীদের সেবা আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে দক্ষ, অভিজ্ঞ, অরাজনৈতিক ও প্রবাসীবান্ধব কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার জরুরি হেল্পলাইন, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাসী সহায়তা সেল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ভিসা জটিলতা নিরসন, বিদেশ যাওয়ার আগে ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সবার জন্য প্রবাসী কার্ড, স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, মৃত প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা, জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া এবং প্রবাসীদের সম্পদ ও বিনিয়োগ সুরক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি সহজ ঋণ, বীমা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকট তৈরি হলে প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবিসহ মোট ১৫ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা।
প্রবাসী ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী।’
তাদের মতে, প্রবাসীদের প্রস্তাবিত ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সরকারের কাছে প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমিরাতের ভিসা জটিলতা এবং দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে আরব আমিরাতপ্রবাসী এনআরবি সিআইপি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের পক্ষে বক্তব্য দেন মোহাম্মদ রুবেল সিআইপি।