ঢাকা: দেশের শরীয়াহ-ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য ও নগদ টাকার সংকট এখনও কাটেনি। সংকট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বড় অঙ্কের বিশেষ তহবিল জোগাতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে ব্যাংক খাতকে টিকিয়ে রাখতে ও জরুরি ক্যাশ টাকার চাহিদা মেটাতে ‘ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি’ এবং বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় মোট ৮০ হাজার ২৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বাজারে সরবরাহ করতে হয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশাল অংকের জরুরি সহায়তার প্রায় ৮৫.৯০ শতাংশ টাকাই সরাসরি ব্যবহার করেছে চরম সংকটে পড়া শরীয়াহ-ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলো। অবশিষ্ট টাকার মধ্যে ৮.১৬ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে অ্যাসার্ড রেপোর মাধ্যমে।
জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য টানাপোড়েন থাকলেও দেশের সামগ্রিক সংকেত ছিল বেশ মিশ্র ও জটিল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজেদের অভ্যন্তরীণ আন্তঃব্যাংক লেনদেন বা ‘কল মানি’ বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে কল মানি বাজারে টার্নওভার ৪.৫৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১,০৪,৮০৬.৩০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে বরাবরের মতোই ১ দিন মেয়াদের বা ওভারনাইট কল মানি লেনদেনের অংশ ছিল সবচেয়ে বেশি, যা মোট লেনদেনের ৮০.৬৫ শতাংশ। স্বল্প নোটিশের লেনদেন ছিল ১৭.৭০ শতাংশ এবং মেয়াদী কল মানি ছিল মাত্র ১.৬৫ শতাংশ।
কল মানি বাজারের একটি ইতিবাচক দিক ছিল সুদের হার হ্রাস পাওয়া। জুলাই মাসে ওভারনাইট কল মানির ভারিত গড় সুদের হার ২৬ বেসিস পয়েন্ট কমে ৯.৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। সামগ্রিক কল মানি বাজারের গড় সুদের হারও ২৭ বেসিস পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৯.৬৮ শতাংশে। একইভাবে ইন্টারব্যাংক রেপো লেনদেন ২০.৭২ শতাংশ কমে ৮৫,৩৫৯.২৯ কোটি টাকা হয়েছে এবং এতেও সুদের হার ২০ বেসিস পয়েন্ট কমে ৯.৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া রেপোর পরিমাণ ৫০.০৬ শতাংশ কমে ৮৯,৭৯২.৩৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ মূল ধারার প্রচলিত ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ টাকা থাকায় তারা আন্তঃব্যাংক ধারের ওপর কম নির্ভর করেছে।
তবে বাজার যখন একদিকে কল মানির কিছুটা স্বস্তি দেখছে, অন্যদিকে সার্বিক তারল্য বৈষম্য পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। একদিকে প্রচলিত কিছু ব্যাংক উদ্বৃত্ত টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি’ বা এসডিএফ-এ জমা রাখার পরিমাণ ৩০.৫৪ শতাংশ কমিয়ে ১,০৪,০৯৪ কোটি টাকায় নামিয়েছে, অন্যদিকে অন্যান্য ব্যাংকের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ‘স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি’ বা এসএলএফ নেওয়ার পরিমাণ আগের মাসের চেয়ে ৭০৮.৮০ শতাংশ বেড়ে ৪৮৫.৯৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
মুদ্রাবাজারে এই টানাটানির মধ্যে আরও বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের স্বল্পমেয়াদী ঋণ গ্রহণ। বাজেট ঘাটতি ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের খরচ মেটাতে সরকার জুলাই মাসে ট্রেজারি বিল ইস্যু করে বাজার থেকে ৪৪,০০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, যা আগের মাসের চেয়ে ১৫.৭৯ শতাংশ বেশি। এর ফলে ৯১ দিন মেয়াদের ট্রেজারি বিলে সুদের হার ৯.২৪ শতাংশ, ১৮২ দিন মেয়াদে ৯.৪৮ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদী বিলে রেকর্ড ৯.৫৫ শতাংশে উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিশেষ তহবিলের ওপর বিশাল নির্ভরতা দেশের বেসরকারি খাতকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলো বাজার থেকে বিপুল অর্থ টেনে নেওয়ায় ব্যাংকগুলোর সাধারণ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের সুদের হার বেড়ে উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নীতি সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোতে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।