Thursday 20 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

খেলাপি ঋণ আদায়ে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২০ আগস্ট ২০২৬ ১৮:০৬ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ ১৮:৫১

ঢাকা: খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার এবং আর্থিক খাতে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ‘অল্টারনেটিভ ডিসপুট রেজ্যুলেশন’ (এডিআর) ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য এডিআর কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার নতুন নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বৃহস্প‌তিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ–সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করে। এতে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর )-এর জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ ও আদালতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে এডিআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন নীতিমালায় যোগ্যতা, সক্ষমতা ও উপযুক্ততা যাচাই করে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এডিআর হচ্ছে প্রচলিত বিচারিক কার্যক্রমের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি পদ্ধতি। এতে বিরোধে জড়িত পক্ষগুলো নিজেরা অথবা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করে। এর মধ্যে মধ্যস্থতা বা Mediation অন্যতম। এক বা একাধিক নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় পক্ষগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।

নতুন নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যোগ্য ও অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, এসব প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ এবং এডিআর কার্যক্রমের গুণগত মান, কার্যকারিতা ও পেশাগত-নৈতিক মান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এডিআর ব্যবস্থার ওপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

এডিআর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে Societies Registration Act, 1860, Partnership Act, 1932 অথবা Companies Act, 1994-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। পাশাপাশি হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন নম্বর থাকতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির কোনো পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খেলাপি ঋণগ্রহীতা হতে পারবেন না। প্রতারণা, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং বা অন্য কোনো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিন বছরের ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এডিআর প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো রাখতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ বা সমমানের প্রশাসনিক পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যকে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।

এ ছাড়া আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট বা সেল, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লিখিত SOP থাকতে হবে। এসব ব্যবস্থায় মামলা গ্রহণ, মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ, মধ্যস্থতা পরিচালনা, নথি সংরক্ষণ, গোপনীয়তা ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের আবেদন করার আগের তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নামে এক বা একাধিক স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সব আর্থিক লেনদেন ওই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

প্রতিটি এডিআর প্রতিষ্ঠানের এক বা একাধিক মধ্যস্থতাকারী প্যানেল থাকতে হবে। প্রতিটি প্যানেলে অন্তত পাঁচজন মধ্যস্থতাকারী রাখতে হবে। এর মধ্যে অন্তত একজন হিসাববিদ ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে।

প্যানেলের সদস্যদের নাম, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত দক্ষতার হালনাগাদ তালিকা সংরক্ষণ করতে হবে। তবে কোনো Politically Exposed Person (PEP)-কে মধ্যস্থতাকারী প্যানেলে রাখা যাবে না।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে হলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন পেশা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা বা বিচারিক কাজে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

বিরোধের কোনো পক্ষের সঙ্গে তার সরাসরি বা পরোক্ষ স্বার্থের সংঘাত থাকা যাবে না। কোনো ফৌজদারি আদালতে দণ্ডিত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তিপ্রাপ্ত কিংবা অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনৈতিকতার কারণে চাকরি বা পেশা থেকে বরখাস্ত ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি বা আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তিও এ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর অন্তত দুটি এডিআর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যস্থতা, যোগাযোগ, দর-কষাকষি ও বিরোধ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অন্তত একটি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা করতে হবে।

প্যানেলভুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের জন্য বছরে অন্তত ২০ ঘণ্টার Continuing Professional Development (CPD) কার্যক্রমও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও CPD-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী দিতে হবে।

এডিআর প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ই-মেইল ঠিকানা রাখতে হবে। অনলাইন বা ভার্চুয়াল মধ্যস্থতা ও শুনানির জন্য ইন্টারনেট এবং অডিও-ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা থাকতে হবে।

এ ছাড়া মামলা গ্রহণ, নথি ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সময়সূচি নির্ধারণ ও প্রতিবেদন তৈরির জন্য Digital Case Management System রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ও মামলাসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তার জন্য সাইবার নিরাপত্তা, Data Backup ও Recovery ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

এডিআর প্রতিষ্ঠানের Conflict of Interest Policy থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো সম্ভাব্য বা প্রকৃত স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে তা দ্রুত লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে। স্বার্থের সংঘাত থাকলে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে হবে।

মধ্যস্থতা শেষ বা ব্যর্থ হওয়ার পরও ওই কার্যক্রমের সময় পাওয়া তথ্য, নথি, যোগাযোগ ও কার্যবিবরণী গোপন রাখতে হবে। আইন, আদালতের আদেশ বা বৈধ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া এসব তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ করা যাবে না। প্রতিটি এডিআর প্রতিষ্ঠানের লিখিত Code of Conduct-ও থাকতে হবে।

এডিআর প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন ব্যবস্থা করেছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৭০ নম্বর পেতে হবে। এর কম নম্বর পেলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে।

মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি ২০ নম্বর করে রাখা হয়েছে মধ্যস্থতাকারী প্যানেল ও মধ্যস্থতাকারীদের যোগ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও সুবিধার জন্য। বিধিবদ্ধ যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় ১০, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় ১৫, আর্থিক বিষয়ে ৫, তথ্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় ৫, স্বার্থের সংঘাত, গোপনীয়তা ও নৈতিকতায় ১০, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে ৫ এবং এডিআর পরিচালনার অভিজ্ঞতায় ১০ নম্বর রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদন, নথি যাচাই ও পরিদর্শনের ফলাফলে সন্তুষ্ট হলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এডিআর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে ৩ বছর। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্তির সময় বিভিন্ন শর্ত আরোপ করতে পারবে।

মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী তিন বছরের জন্য তালিকাভুক্তি নবায়ন করতে পারবে। প্রয়োজনে নবায়নের আগেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, অবকাঠামো, সক্ষমতা ও নথিপত্র পুনরায় যাচাই বা পরিদর্শন করা যাবে।

মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া, পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন, গোপনীয়তা ভঙ্গ, স্বার্থের সংঘাত গোপন বা নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ বিধান লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্তি স্থগিত করতে পারবে।

গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা বা অসদাচরণে জড়িত হওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মানা কিংবা এডিআর ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা বা সুনাম ক্ষুণ্ন হয়— এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদও দিতে পারবে।

প্রতিটি তালিকাভুক্ত এডিআর প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ক্যালেন্ডার বছর শেষে পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এতে মোট কতটি বিরোধ এসেছে, কতটি চলমান, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, নিষ্পত্তির হার এবং গড় নিষ্পত্তির সময় উল্লেখ করতে হবে।

এ ছাড়া নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, মানবসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণও দিতে হবে।

এডিআর প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালা মেনে কাজ করছে কি না তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবে। অফিস, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, নথি, হিসাব-রেকর্ড এবং এডিআর কার্যক্রম-সংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করার ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

কোনো সেবাগ্রহীতা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ এডিআর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে সতর্কীকরণ, আর্থিক জরিমানা, তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিলসহ ব্যবস্থা নিতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সার্কুলারটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ আদালতের বাইরে দক্ষ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হলো। একই সঙ্গে এডিআর প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা, মধ্যস্থতাকারীদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গোপনীয়তা, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহির জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই নীতিমালার আওতায় কত টাকা খেলাপি ঋণ বা কতটি মামলা কত সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে— এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা সার্কুলারে উল্লেখ নেই।