Thursday 27 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

৪১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, ১৭ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৭ আগস্ট ২০২৬ ১৫:০২

ঢাকা: গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোরও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ১৭টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের অংশগ্রহণে ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়ে‌ছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায় ১৭টি ব্যাংকের চুক্তি সম্পন্ন হয়ে‌ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে। পুরো প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালুর জন্য।

বিজ্ঞাপন

তহবিল থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করা ১৭টি ব্যাংক হলো—সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক।

এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ এই তিন ব্যাংক থেকেই ২৪ হাজার কোটি টাকা আসবে।

তবে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাংকেরই অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত। এ কারণে কিছু ব্যাংক এই তহবিলে অর্থ দিতে অনাগ্রহী ছিল। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তহবিলে অর্থ দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের বড় প্রশ্ন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সমাধান না করে বন্ধ কারখানায় অর্থায়ন করলে সেই ঋণ কতটা কার্যকর হবে।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোই গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। সেখানে বছরের পর বছর বন্ধ থাকা একটি কারখানা নতুন করে ঋণ নিয়ে উৎপাদনে ফিরলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

তাই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানার পাশাপাশি বর্তমানে সচল কিন্তু নানা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, বাস্তবতা যাচাই না করে বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে। এতে উদ্যোক্তার পাশাপাশি ব্যাংক খাতেও ঝুঁকি বাড়বে।

শিল্প খাতের সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে পোশাকশিল্পেও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সদস্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ হাজার থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৮০০টি সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘গ্রিন সোয়েটার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে গত এক বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাদের মতে, শুধু অর্থের অভাবে নয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ, উৎপাদন ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যার কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে।

ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে ঋণ দিলেই উৎপাদন শুরু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্যাংকারদেরও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু কম সুদের ঋণ যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে গ্যাসের সহজলভ্যতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।

একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, একটি কারখানাকে কম সুদে ঋণ দেওয়া হলো, কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় যদি সেটি উৎপাদন করতে না পারে, তাহলে ঋণের কিস্তি পরিশোধও কঠিন হবে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়বে এবং নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার, অর্ডার, জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং আগের ঋণের পরিস্থিতি ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য মনে করেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কম সুদের এই ঋণ কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণের চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়তে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ যাতে নির্দিষ্ট খাতেই ব্যবহার হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ হয়েছে, সেটি আবার চালু করলে উৎপাদন ধরে রাখার মতো সক্ষমতা আছে কি না এবং বাজারে ওই পণ্যের চাহিদা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই ঋণ দিতে হবে। শুধু বন্ধ কারখানা হিসেবে বিবেচনা করে ঋণ দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
প্যাকেজের বড় অংশ বন্ধ কারখানার জন্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বিশেষভাবে বন্ধ কারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাকি অর্থ শিল্পের চলমান মূলধন, উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৪১ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সহায়তা এ উদ্যোগকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করছে।

তবে উদ্যোক্তা, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ—তিন পক্ষেরই বক্তব্য, এই তহবিলের সফলতা নির্ভর করবে ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং শিল্পের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে কম সুদের ঋণ দিয়েও বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসইভাবে উৎপাদনে ফেরানো কঠিন হবে।

ফলে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজকে শুধু ঋণ বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে না দেখে শিল্পের জ্বালানি, বিনিয়োগ পরিবেশ, বাজার ও অবকাঠামোগত সংকট সমাধানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।