ঢাকা: ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম কেবল রাজনীতির সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা জড়িয়ে যায় রহস্য, নীরবতা এবং নাটকীয়তার এক দীর্ঘ ট্র্যাজেডিতে। চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আবুল হারিছ চৌধুরী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে যার একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিত অনেক হিসাব-নিকাশ, সেই মানুষটিই জীবনের শেষ দিনগুলো পার করেছেন সম্পূর্ণ নিভৃতে, অন্য এক পরিচয়ে, অন্য এক নামে।
২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ‘প্রফেসর মাহমুদুর রহমান’। ঢাকার সাভারের কমলাপুর জালালাবাদ এলাকার জামিয়া খাতামুন্নাবিয়্যিন মাদরাসা কবরস্থানে পাঁচ লাখ টাকা অনুদানের মাধ্যমে দাফন করা হয় তাকে। উপস্থিত দু-একজন ছাড়া কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি, সাদা কাফনে মোড়া এই নিথর দেহটি আসলে কার। তিনি আর কেউ নন বিগত দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তোলপাড় সৃষ্টি করা বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী।
২০০৭ সালের ১/১১-এর পটপরিবর্তন। এর পরপরই দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। এরপর তাকে ঘিরে তৈরি হয় একের পর এক গল্প। কখনো খবর এসেছে তিনি লন্ডনে, কখনো ভারতে, আবার কখনো বলা হয়েছে তিনি ইরানে ভাইয়ের কাছে অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও একাধিক মামলার রায়ে তার নাম জড়িয়ে পড়েছিল নানা বিতর্কে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাসহ একাধিক মামলায় তার অনুপস্থিতিতেই সাজা ঘোষণা করা হয়। তবে ক্ষমতার দাপট থেকে একলহমায় ছিটকে পড়ে কীভাবে একজন মানুষ এক দশক ধরে নিজের প্রিয় মাতৃভূমিতেই ‘অদৃশ্য’ হয়ে বেঁচে রইলেন, তা আজও এক বিস্ময়।

২০২২ সালের শুরুর দিকে পরিবারের তরফ থেকেই একটি বার্তা আসে তিনি নাকি লন্ডনের হাসপাতালে করোনায় মারা গেছেন। তবে এটি ছিল কেবলই একটি পর্দা, যা ঢেকে রেখেছিল সাভারের সেই নির্জন কবরস্থানকে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন রাজনীতিবিদকে মৃত্যুর পরও কেন নিজের পরিচয় গোপন করে মাটির নিচে ঘুমাতে হবে? এই প্রশ্ন তাড়িয়ে বেরিয়েছে তার মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরীকে। বাবার মৃত্যুর পর তিনি আইনি লড়াই শুরু করেন। বাবাকে তার নিজ পরিচয় ফিরিয়ে দিতে, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্য সম্মান দিতে এবং মিথ্যার অক্টোপাস থেকে সত্যকে বের করে আনতে তিনি দ্বারস্থ হন হাইকোর্টের।
রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সাভারের সেই কবরস্থান থেকে আদালতের নির্দেশে উত্তোলন করা হয় হারিছ চৌধুরীর দেহাবশেষ। সাভার উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় নমুনা। উদ্দেশ্য একটাই বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণ করা যে, ‘প্রফেসর মাহমুদুর রহমান’ ছদ্মনামের আড়ালে শুয়ে থাকা মানুষটিই আবুল হারিছ চৌধুরী।
রাজনীতিবিদ হারিছ চৌধুরীর কেবল একটি বিতর্কিত পিঠ ছিল না, ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল অতীতও। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় সৈনিক। ভারতের মেঘালয়ে প্রশিক্ষণ শেষে সিলেটের রণাঙ্গনে ‘স্পাই’ হিসেবে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিএনপি গঠনে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১৩ বছর দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
বিশেষ করে সিলেটের আঞ্চলিক উন্নয়নে তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৯৫ সালে ‘সিলেট বিভাগ’ বাস্তবায়নে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল অন্যতম। রাস্তাঘাট, বড় সেতু নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা কিংবা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি সিলেটের মানুষের মনে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন।
আজ হারিছ চৌধুরীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। ক্ষমতার সুউচ্চ শিখর থেকে নিভৃত আত্মগোপন, এবং সবশেষে এক অচেনা নামে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়া, হারিছ চৌধুরীর জীবন যেন ক্ষমতার অসারতা আর নিয়তির এক নির্মম দলিল। তবে রাজনীতি যাই বলুক না কেন, ইতিহাস সব সময় তার নিজস্ব নিয়মে সত্যকে খুঁজে নেয়। ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে আজ অন্তত সেটুকুই নিশ্চিত হয়েছে যে, সেই কবরে শুয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নন বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঝোড়ো অধ্যায় আবুল হারিছ চৌধুরী।