ফরিদপুর: ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য পরিচয়ে একটি কলেজের ছয় শিক্ষককে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বোয়ালমারী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজে।
পৃথক পৃথক মোবাইল নম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে ফোন করে ১ লাখ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ‘টোকেন মানি’ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।
টাকা না দিলে পরিবারসহ ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। এতে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে পাঁচ শিক্ষকের পক্ষে বোয়ালমারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের শিক্ষক পরেশ কুমার পাল।
জিডিতে পরেশ কুমার পাল উল্লেখ করেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ৫৭ মিনিটে কলেজে অবস্থানকালে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তার মুঠোফোনে ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে ‘গৌতম বিশ্বাস’ পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি সর্বহারা পার্টির বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য। একপর্যায়ে ‘সিরাজ সিকদারের ছোট ভাই মহিউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে কথা বলেন’ বলেও দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনদাতা প্রথমে এক লাখ টাকা এবং পরে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা টোকেন মানি দাবি করেন। সংগঠনের সহকর্মীদের কারাগার থেকে মুক্ত করতে অর্থ প্রয়োজন বলে জানিয়ে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হয়। টাকা না দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হয় বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরেশ কুমার পাল বলেন, সম্প্রতি রংপুরে পরিবারসহ এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
একই ধরনের ফোন ও হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কলেজটির শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা, সজল কান্তি বিশ্বাস, প্রদীপ কুমার সাহা ও দেবাশীষ রায়। তাদের কাছেও চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অধ্যাপক দেবাশীষ রায় বলেন, ফোন করে তার কাছে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা জানালে ফোনদাতা তার ছেলের পায়ে গুলি লাগলে যেভাবে চিকিৎসার জন্য টাকা সংগ্রহ করবেন, সেভাবে পরিচিতজনদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে পাঠাতে বলেন। একই সঙ্গে চরমপন্থা নিতে বাধ্য করবেন না বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা বলেন, ফোনদাতারা তাদের সহকর্মীদের কারাগার থেকে জামিনে ছাড়াতে অর্থ প্রয়োজন বলে টাকা দাবি করেন। তাকেও পরিবারসহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে একই কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবীন লস্করও একই ধরনের ফোন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, দুইদিন আগে তাকে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কে তিনি ফোনদাতাদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি ও হুমকির ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হুমকিদাতারা প্রকৃতপক্ষে কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, নাকি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজির চেষ্টা করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষকের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর হুমকিদাতারা কীভাবে সংগ্রহ করেছে, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
অভিযোগকারী শিক্ষক পরেশ কুমার পাল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা ও আমাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় হামলা বা প্রাণনাশের ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করছি।’
কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার রাতে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতারকচক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে হুমকিদাতাদের পরিচয় ও ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।