Saturday 05 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আছে চ্যালেঞ্জ / ভোটের আগে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের প্রস্তুতি ইসির

নাজনীন লাকী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২১

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতেতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলর, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। যদিও পরে সেসব জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে হাত দেয়নি সরকার। কিন্তু স্থানীয় সরকারের প্রান্তিক এই অংশটি এমনিতেই জনপ্রতিনিধিহীন হয়ে পড়ে।

এর পেছনে কারণ হলো- দেশের বেশিরভাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ায় গা ঢাকা দিয়েছেন। আবার গ্রেফতার হয়ে অনেকে কারাগারে আছেন। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এই স্থবিরতা কাটাতে আসছে নভেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থার গতি ফেরাতে বহুল প্রতীক্ষিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন নেতৃত্বাধীন কমিশন। তারা এরই মধ্যে প্রায় অনেককিছু গুছিয়ে এনেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূল ইউনিট ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

নির্বাচনের মালামাল ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি

দ্রুত ভোট গ্রহণের জন্য এরই মধ্যে আগাম কেনাকাটা সেরে রেখেছে কমিশন। ইসি সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনের সময়ই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মালামাল কিনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানি ব্যাগ প্রতিটি ১ লাখ ১৫ হাজার পিস এবং বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার পিস। এ ছাড়া, ১৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিং সিল এবং ৮ লাখ ৪০ হাজার অফিসিয়াল সিলসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনা আছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, কেনাকাটার দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ই এসব মালামাল বাড়তি কিনে রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া পুরো নির্বাচন কাগজের ব্যালট পেপারে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা ও কঠোর আইনি সংস্কার

স্থানীয় সরকারের সবস্তরের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউপি, উপজেলা ও জেলা পরিষদ) আইনে সামঞ্জস্য আনতে একাধিক সংশোধনের প্রস্তাব কমিশন পর্যায়ে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এগুলো মধ্যে গুরুত্বপূর্ণগুলো হলো-

ঋণখেলাপিদের লাগাম টানা: কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হলেও আগের ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপির দায় থেকে মুক্ত হবেন না এবং অযোগ্য ঘোষিত হবেন।

অন্যান্য অযোগ্যতা: এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক, ঋণখেলাপি এবং খেলাপি ঋণের জামিনদাররা প্রার্থী হতে পারবেন না।

লাভজনক পদ ও নৈতিক স্খলন: প্রজাতন্ত্র, সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ বা সরকারের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার থাকা কোম্পানিতে সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত পদকে ‘লাভজনক পদ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, চুরি, আত্মসাৎ, ধর্ষণ, হত্যা ও দুর্নীতিকে ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’ হিসেবে স্পষ্ট করা হয়েছে।

নির্ভরশীল ব্যক্তির সংজ্ঞা: প্রার্থীর স্বামী/স্ত্রী এবং প্রার্থীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই ও বোনকে এর অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কঠোর শাস্তি, পর্যবেক্ষক ও বিচারিক সংস্কার

কঠোর শাস্তি ও জরিমানা: নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অপরাধে আগের ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্তকরণ: নির্বাচনকালীন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অনুমোদিত পর্যবেক্ষক: কমিশন বা অনুমোদিত সংস্থা থেকে লিখিত অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংস্থাই কেবল ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক’ হিসেবে গণ্য হবেন।

বিরোধ নিষ্পত্তি: নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং মতদ্বৈততা এড়াতে আপিল ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ

কমিশন নিজস্ব প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকেও আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে বলছে। এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ আগস্ট পুলিশ মহাপরিদর্শক, ১৯ আগস্ট আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক এবং ২৪ আগস্ট বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

কমিশন প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার ভোট শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। এর আগে বলা হয়েছিল, অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে আগস্টে তফসিল দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

গত ২৪ আগস্ট সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, এখনই ভোটের দিনক্ষণ বলা সম্ভব নয়। নির্বাচন আয়োজনের সময় দুর্গাপূজা, বন্যার আশঙ্কা, আবহাওয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন সিইসি।

দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা

চলতি মাসের শেষে বা আগামী মাসের শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে ইসি।

বর্তমানে কমিশনকে তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো- মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় নির্বাচনে আঞ্চলিক কোন্দল বেশি থাকায় সহিংসতা প্রতিরোধে সব কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত। তৃতীয়ত, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা যাচাইয়ে কঠোর আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করা। চতুর্থত, সব প্রার্থী ও ভোটারদের জন্য সমান সুযোগ এবং ভীতিহীন পরিবেশ বজায় রাখা।

কমিশন ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন ও বিধিমালা সংশোধন। কমিশন পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি ও নির্বাচন পরিচালনার বিধি নিয়ে কাজ করছে। আচরণবিধির খসড়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতও নেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন পরিচালনার নিয়মও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। সরকার থেকে যখন বলা হবে, তখন যেন আমরা নির্বাচনটা করে ফেলতে পারি। আমাদের ৪৫ দিন আগে জানালেই নির্বাচন করে ফেলতে পারব।’

এ বিষয়ে আরেক নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘কমিশন নানান কাজের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলীম সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কখনো সংলাপ করেনি। এবার যদি সংলাপ করে, তাহলে ভালো হবে। কারণ, এই নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর নানান অভিযোগ রয়েছে। অনেকে কমিশনে এসেও নানা অভিযোগ জানাচ্ছেন। তাই দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করা জরুরি।’

দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধিহীন থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবার গতি ফেরাতে সিইসি নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের এই প্রস্তুতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

আরো

নাজনীন লাকী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর