Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

গ্যাসের লাগামহীন দামে স্থবির জনজীবন

ফাহিম হাসনাত
৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:২১

আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের জন্য কোনো হল নেই, যদিও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ১টি মাত্র হল রয়েছে। ফলে আমার মতো হাজারো শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় মেসভাড়া, খাবার, পানি আর এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাস সংকট।

রাজধানীর ধোলাইপাড় আমাদের মেস। বাসায় লাইনের গ্যাস না থাকায় রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার। গত বৃহস্পতিবার সকালে বাসার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। গ্যাস কিনতে বাজারে গিয়ে পড়তে হয় মহাবিপাকে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও দোকানদার আমার কাছে ২০০০ টাকা দাবি করেন। শুনে মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা! এইতো সপ্তাহ দুয়েক আগে আমার বাড়িতে (নরসিংদী) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনলাম ১৩০০ টাকা দিয়ে, মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে সেটা ৭০০ টাকা বেড়ে গেলো!

বিজ্ঞাপন

আরো কয়েকটা দোকানে ঘুরলাম। কেউ বলে সিলিন্ডার গ্যাস নেই আবার কারোর এখানে দাম আরো বেশি৷ এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাম এত বেশি কেনো?’ জবাব দিলো, ‘আমাদেরকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে অপেক্ষা করেন, কাল পরশু কমবে হয়ত’।

কিন্তু পরদিন শুক্রবার বাজারে গিয়ে দেখি, দাম আরও বেশি চওড়া। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে গতকালের দোকান থেকেই ২০০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হলাম।

সিলিন্ডার গ্যাসের দাম হঠাৎ এভাবে বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিক কোনো কারন দোকানদারদের কাছে থেকে জানতে পারিনি। তবে পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, সিলিন্ডার গ্যাস সরবারহকারী দেশের দুটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই গ্যাস আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলে দোকানীদের ডিলারের কাছ থেকে চড়া গ্যাস দামে গ্যাম কিনতে হচ্ছে। এ কারণে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়তি।

প্রশ্ন হলো, এই ভোক্তা কারা? তারা কি বড়লোক? তারা কি বিকল্প জ্বালানির সুযোগ রাখে? বাস্তবতা হলো, এদের বড় একটি অংশ আমাদের মতো শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; যাদের মাসের হিসাব চলে টানাটানিতে। অবস্থা যদি এই হয় তাহলে আমাদের মতন সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

সিলিন্ডার গ্যাসের এই অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বাজার ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজি। যখন সারা বিশ্বের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে, তখন আমাদের দেশে কেন বারবার সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করা হবে? যারা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সামর্থ্য রাখে না, তাদের জীবনের ওপরই কেনো বারবার এই বিপর্যয় নেমে আসবে?

এই প্রশ্নের জবাব চাইবো কার কাছে?

সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, আপনারা আরো সচেষ্ট হউন। শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নিশ্চিত করতে হবে যে নির্ধারিত দামেই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। কোনো ডিলার বা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা করুন।

কেউ সিন্ডিকেট করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। যার ফলে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকবে। এতে বোঝা যাবে ঠিক কোথায় মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।

প্রয়োজনে গ্যাস সরবরাহ প্রতিষ্ঠানসমূহকে জবাবদিহির আওতায় আনুন— কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করল।

খুব দ্রুতই গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসুন। তা না হলে এই জ্বালানি সংকটের আগুন সাধারণ মানুষের হাহাকারকে আরও দীর্ঘ করবে।

সর্বোপরি বলতে চাই, জ্বালানি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর অতি মুনাফার হিংস্র লালসার কাছে সাধারণ মানুষের জীবন জিম্মি থাকতে পারে না। প্রশাসন কঠোর হলে এবং বাজার তদারকি জোরদার করলে এই সংকট সমাধান করা মাত্র কয়েক দিনের ব্যাপার। আমরা চাই সরকার দ্রুত সচেষ্ট হোক এবং সিন্ডিকেটের এই আগুনের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুক।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, দপ্তর সম্পাদক, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি ফিচার কলাম এন্ড কনটেন্ট রাইটার্স

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো