বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ জন্য সর্বপ্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তার লিখিত নির্দেশনার ফলেই প্রস্তাবিত ‘বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’-এর পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
এই আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। অত্যন্ত কাছ থেকে আমি দেখেছি, কীভাবে একটি আধুনিক, বহুমাত্রিক ও সময়োপযোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ছাড়াও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখায় শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো একক বিষয়ের বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের আন্তরিকতা ও সমন্বয়মূলক ভূমিকা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— আমি কখনো তাকে বিশ্ববিদ্যালয়টি কোথায় হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার পক্ষে অবস্থান নিতে শুনিনি।
বরং সংসদের স্থায়ী কমিটিতে আইনটি উপস্থাপনের দিন আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যেখানে উপযুক্ত মনে করবেন, বিশ্ববিদ্যালয় সেখানেই হবে।’
এ কারণেই আজ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হওয়ার পর আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে অনেকেই স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে বিভক্তি, মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ কিংবা জনদুর্ভোগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের অধিকার অবশ্যই রয়েছে; তবে সেই অধিকার যেন জনস্বার্থ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জেলার সম্মান ক্ষুণ্ন না করে— সেদিকে আমাদের সবার দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো— কোন স্থানটি বগুড়ার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে উপযোগী। এই সিদ্ধান্ত আবেগ বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং বিশেষজ্ঞ মতামত, কারিগরি সমীক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় গ্রহণ করা উচিত। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমীক্ষা, পরিকল্পনা ও নীতিগত বিবেচনার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। আজ কোন বিভাজন নয়, প্রয়োজন ঐক্য। পারস্পরিক দোষারোপ নয়, প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর আলোচনা। আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি, যাতে বগুড়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ বিতর্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে। আমার আন্তরিক আহ্বান— বগুড়ার সকল সংসদ সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সচেতন নাগরিক একসঙ্গে বসুন, আলোচনা করুন এবং একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য গড়ে তুলুন। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকে সম্মান জানিয়ে আমরা সবাই যেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করি। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়টি কোনো একটি এলাকার নয়— এটি সমগ্র বগুড়ার, উত্তরাঞ্চলের এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্পদ।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়