Sunday 26 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

ড. মিহির কুমার রায়
২৬ জুলাই ২০২৬ ২০:০৫

বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোলট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বিশ্বে মুরগির মাংস উৎপাদনে শীর্ষ ৫০টি দেশের মধ্যেও নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, এমনকি শ্রীলঙ্কাও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক উৎপাদন ডাটাবেজের (FAOSTAT) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফার্মের মুরগির (তাজা ও প্রক্রিয়াজাত) মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫০৭ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন। এই উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের ১৮৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ৫৩তম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো বেশ পেছনে রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পোলট্রি খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফার্মের মুরগি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে জায়গা করতে পারেনি। এফএও-এর ডেটা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার, যা পাঁচ বছর আগে প্রায় ২ লাখ ছিল।গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামার উৎপাদন কার্যক্রম থেকে বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার অনিবন্ধিত খামার পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন, ক্রমে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পোল্ট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য (ফেয়ার প্রাইস) নির্ধারণের দাবি জানিয়ে,সংগঠনটি বলছে ‘উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন। ‘সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে এবং খামারিদের ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। খামারিদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর; এটা প্রত্যাহারের দাবি অগ্রগণ্য। প্রতিবেশী দেশগুলোতে কাঁচামালে এমন কর নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে পোল্ট্রি খাতে সুফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করা হোক। উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আগামী এক দশকে পোল্ট্রি খাত সফল শিল্প খাতে পরিণত হবে। যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনো ভোক্তাকে সাড়ে ১০ টাকায় ডিম কিনতে হয়। ডিম পচনশীল পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করতে পারেন না, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধস্থতাকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।’

পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার, খামারি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বাজারে ডিম ও মুরগির সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে। পোল্ট্রি খাতকে টেকসই রাখতে এখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনও বাড়বে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এফএও-এর এই ডাটাবেজ থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে এখনো বিশাল উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৩তম অবস্থানে থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশে পোলট্রি খাতের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মুরগির মাংসের উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে পোলট্রি ফিডের দাম কমাতে হবে। কারণ মুরগি উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় খাদ্যের পেছনে। এছাড়া খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা এবং বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বতালিকায় আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের পোলট্রি বা পোলট্রিশিল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি চালিকাশক্তি। এই বিশাল শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত রয়েছে ৬০ লাখের বেশি মানুষ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো, এই বিপুলসংখ্যক কর্মীর ৪০ ভাগই নারী। তারা কেবল শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন না, বরং অনেকেই নিজ উদ্যোগে খামার গড়ে তুলেছেন। আধুনিক কৃষি ও পোলট্রিশিল্প এখনো দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। অন্ধের মতো চাকরির পেছনে না ছুটে, সঠিক পরিকল্পনা ও বুঝেশুনে কৃষিতে বিনিয়োগ হতে পারে বেকারত্ব ঘোচানোর দারুণ এক উপায়। তবে এই খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কৃষি প্রশিক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষিশিল্পের বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, যথাযথ কর্তৃপক্ষ তৃণমূল পর্যায়ের এই বিষয়গুলো গভীরভাবে আমলে নেবে। তরুণদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি, নতুন উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে পারলে কৃষির হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামীর এক সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।

লেখক: কৃষি অথনীতিবিদ

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর