বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ধরন গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। একসময় যে দেশকে শুধু দারিদ্র্য, দুর্যোগ ও উন্নয়ন সহায়তার প্রেক্ষাপটে দেখা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনার জন্য নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও দেশের উৎপাদনশীলতা, তৈরি পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স এবং অবকাঠামো উন্নয়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা তৈরি করেছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এবং আরও শক্তিশালী করতে আমাদের কী করতে হবে?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়া কোনো সাধারণ অর্জন নয়। গত দুই দশকে দেশের জিডিপি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমে মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশের সক্ষমতার নতুন পরিচয় বহন করছে। এসব উন্নয়ন কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগই সহজ করেনি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রপ্তানি। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং জাপান বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নিরাপদ কারখানা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে বাংলাদেশের অগ্রগতি বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত লিড (LEED) সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। দেশে বর্তমানে ২৯০টি লিড-সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ১২৫টি প্লাটিনাম ও ১৪৫টি গোল্ড মানের। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সবুজ কারখানার মধ্যে ৫৩টিই বাংলাদেশে অবস্থিত। যা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দেশের একটি বড় সাফল্য। তবে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে রপ্তানিকে বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক, প্লাস্টিক পণ্য, জাহাজ নির্মাণ এবং আইটি সেবার মতো খাতগুলোতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের শতাধিক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতেও বাংলাদেশের তরুণরা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি তার মানবসম্পদ। প্রায় ১৮ কোটির এই দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর হার অত্যন্ত বেশি। এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশক ধরে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা শুধু শ্রমবাজারেই অবদান রাখছেন না, প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বৃদ্ধিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে ভবিষ্যতের জন্য শুধু স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে না। বিশ্ব এখন দক্ষ প্রকৌশলী, নার্স, আইটি বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবীদের চাহিদার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ যদি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করে তাহলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা কম নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্ক এবং শিল্পাঞ্চলগুলো এই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব রূপ দিতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনা থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে কিছু কাঠামোগত সমস্যা। নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অনিশ্চয়তা, কাস্টমস প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং ব্যবসা পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয় অনেক বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি।
জ্বালানি নিরাপত্তাও বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহের বহুমুখীকরণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-গভর্নেন্স, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে বাংলাদেশের তরুণরা এই খাতেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সফল হতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমিও ভবিষ্যতের অন্যতম সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল, সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অন্যান্য বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পর্যটন খাতও এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বিপণন, নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নত না হলে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না।
একটি দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি শুধু অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না। দেশটির সুশাসন, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং নীতিগত স্বচ্ছতাও আন্তর্জাতিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিদেশি বিনিয়োগকারী কিংবা আন্তর্জাতিক অংশীদাররা এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করেন যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, চুক্তির নিরাপত্তা থাকবে এবং ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থাকবে না। তাই প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশ্বে প্রশংসিত। এই অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যও দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তির একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামী দিনে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে এবং পরবর্তীতে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, রপ্তানির বহুমুখীকরণ কার। দ্বিতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা। চতুর্থত, জ্বালানি ও অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা। পঞ্চমত, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব নীতি, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, কর কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার এখনো উন্মুক্ত। বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনশক্তি, রপ্তানি সক্ষমতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে শুধু অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে, প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। তাই এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। স্থিতিশীলতা যদি আস্থায় রূপ নেয়, প্রবৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতায় রূপান্তরিত হয় এবং সম্ভাবনা যদি কার্যকর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রতিফলিত হয় তাহলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সমগ্র এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট