Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ভাল্লুক হৃদয়ের কথা

ফয়সাল বিন মজিদ
৬ অক্টোবর ২০২২ ১৬:৪৭ | আপডেট: ৭ অক্টোবর ২০২২ ২০:৫৭

আপনি যদি ফেসবুকে নিয়মিত ঘোরাফেরা করেন তাহলে বছরের কোন সময় কোন বিষয় নিয়ে এখানে তর্ক-বিতর্ক হবে তার একটা নির্ভুল ক্যালেন্ডার অনুমান করে নিতে পারবেন। যেমন পহেলা বৈশাখের আগে আগে মুসলমানদের জন্য এটা পালন করা ঠিক না বেঠিক, শবে বরাত আসলে রুটি হালুয়া খাওয়া যাবে কি না, রোজার সময় তারাবির নামাজ কয় রাকাত, কুরবানীর ঈদে মনের পশু বনাম বনের পশু ইত্যাদি। তেমনি বছরের এই সময় দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র গত পাঁচ, সাত বছর ধরে ধর্ম যার যার উৎসব সবার নাকি উৎসব তার তার- এই তর্কে আমরা জড়াচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু তাই না, আপনি পূজার সময় উইশ করলে বা পূজা দেখতে গেলেই ধর্মচ্যুত হয়ে যাবেন এরকম মত জোরালো হতে হতে এই তর্ক ক্রমেই হাইপার ও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে।
ফেসবুক যেটা করে তা হলো, ধর্মীয় ইস্যুতে বেছে বেছে রি-একশনারি কমেন্টস, পোস্টগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে, ছড়িয়ে দেয়। কেননা এসব রিএকশনারি কমেন্টস পোস্ট লাইক-শেয়ার বেশি হয়। বেশিরভাগ মানুষ যাদের এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই তারা এত কমেন্টস স্ট্যাটাস লেখেন না। ফলে রি-একশনারি মতগুলোকে কেন্দ্র করেই সোশ্যাল মিডিয়া একটা বিদ্বেষপূর্ন ও বিভাজনমূলক সমাজ বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির করছে। যেসব ফেসবুক ওপিনিয়ন বিল্ডাররা ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে ইনফ্লুয়েন্স করতে চান, উৎসবের সময়গুলো তাদের জন্য বিতর্ক উস্কে দিয়ে আলোচনায় আসার ‘পিক সিজন’। অন্যদিকে যেসব সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটি এন্টারটেইন বা এডুটেইনমেন্ট কন্টেন্ট দেন তাদেরকে আমরা এসব বিতর্ক এড়িয়ে চলতে দেখি। হিসাবটা পরিষ্কার, কেননা তাদের কন্টেন্ট হয় মত-পথ নিরপেক্ষ। এদের ফলোয়াররাও সমাজের সব সেগমেন্টের। তাই এসব বিতর্কে অংশ নিয়ে ফলোয়ার এবং রেভেনিউ হারানোর ঝুঁকি তারা নেবেন না, এটাই স্বাভাবিক। ব্যতিক্রম যে ঘটবেনা তা না। আর এরকম ব্যতিক্রমী কাজ করেছেন এন্টারটেইনিং হিউমারাস কন্টেন্ট মেকার মাহবুব মোর্শেদ হৃদয় ওরফে ‘Bear দ্য ভাল্লুক’

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর ছেলে হৃদয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- কুয়েটের মেকানিক্যাল ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট ও কুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় নানান ক্যারেক্টার প্লের মাধ্যমে তিনি ভার্সিটি লাইফকে নিয়ে আসেন তার ভিডিওতে। এডমিশন, এক্সাম, কোচিং, টিউশনি, রেগিং, ক্লাবিং, ট্যুর, ট্রিটসহ এখনকার ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের দৈনন্দিন জীবন, বিনোদন, লক্ষ্য, স্ট্রাগল উঠে আসে তার ক্যারেক্টারগুলোতে। তার ফ্যান-ফলোয়াররাও মূলত কলেজ আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা। প্রায় এক বছর আগে ক্রিয়েট করা তার পেজের ফলোয়ার সংখ্যা এখন ১ লক্ষ ১২ হাজার। কিন্তু সে তুলনায় তার প্রতিটি ভিডিওর এনগেজমেন্ট ও ভিউ অনেক বেশি। কোন কোন ভিডিওর ভিউ এক দেড় মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

এ বছর দুর্গা পূজার সময়ে হৃদয় তার ‘Bear দ্য ভাল্লুক’ ফেসবুক পেজ থেকে একটা ভিডিও পাবলিশ করেছেন যার শিরোনাম ‘আমরা শ্রদ্ধা করি সবার মত কে, মেনে চলি নিজের বিশ্বাস। ভালো থাকি সবাই মিলে! #আমরাইবাংলাদেশ।’ এখানে হৃদয় তার স্বভাবসুলভ হিউমারের ভেতর দিয়ে অন্য ধর্মের উৎসবে হামলা বা শান্তি নষ্ট করার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন। ভিডিওটির মূল বার্তা ছিল এ রকম- উৎসব সবার নাকি তার তার, যে মতের অনুসারীই আমরা হই না কেন, কারো ধর্মীয় উৎসব নষ্ট করার অধিকার আমাদের কারো নেই। এবং কেউ অন্য ধর্মের উৎসবে সামিল হলে বা শুভেচ্ছা জানালে তা নিয়ে অন্য কারোর মাথা ঘামানোরও কিছু নেই।

যথারীতি হৃদয়ের অন্য কন্টেন্টের মত এই কন্টেন্টেও মানুষ বিনোদিত হয়েছে। অধিকাংশ কমেন্টসে এরকম সময়পোযগী ম্যাসেজের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে কিছু কিছু কমেন্টসে তাকে সেকুলার, দালাল বলে বুলিং করা হয়েছে। ঘোষণা দিয়ে তার পেজ আনফলোও করেছে তার কোন কোন ভক্ত।

এই ভিডিওটি দেখার পর হৃদয়ের সাথে আমি কথা বলি। জানতে চাই এরকম সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে কন্টেন্ট করার ঝুঁকি কেন নিলেন। হৃদয় বলেন- ‘ধর্মীয় বা কম্যুনাল ইস্যু আমি এড়িয়ে চলি ঠিকই, কিন্ত বছর বছর এ নিয়ে যা হচ্ছে তা শুধু উৎকণ্ঠার নয়, এক রকম বিরক্তির পর্যায়ে চলে গেছে আমার কাছে । অনলাইন তো বটেই, ভার্সিটির ডিবেটিং ক্লাবের নেতৃত্ব দিতে গিয়েও এ ধরণের ধর্মীয় সেন্সিটিভিটি নিয়ে সহপাঠীদের মধ্যে বিভেদ হতে দেখেছেন তিনি। হৃদয়ের মতে, আমাদের যেখানে প্রফেশন, কেরিয়ার, জব অপরচুনিটি নিয়ে আলাপ ও বিতর্ক করার কথা সেখানে এসব ব্যক্তিগত বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে মেতে থেকে আমরা নিজেরা কি পাচ্ছি, আর সোসাইটিকেই বা কি দিচ্ছি। বিভাজন আর অশান্তি ছাড়া। তিনি বলেন, অধিকাংশ মানুষ এ ধরণের যে কোন বিভাজনের মাঝখানে অবস্থান করেন। শান্তিপ্রিয় বলে তারা কথা বলেন না। কিন্তু এই বিভাজনের মাঝেও সম্প্রীতি রক্ষায় তাদেরকেও কথা বলতে হবে।’

লেখক: উন্নয়নকর্মী

সারাবাংলা/এসবিডিই