মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চাবিকাঠি হলো তার ভেতরের ইচ্ছা, আত্মসম্মান এবং সফলতার জায়গাটুকু কৌশলে জাগিয়ে তোলা। জন সেন্ট জোন্সের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে: ‘আপনি যদি মানুষকে দিয়ে একটি জাহাজ বানাতে চান, তবে তাদেরকে আগে কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ না দিয়ে মনে সুবিশাল ও অসীম সমুদ্রের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলুন।’ আর এ কাজে তাকে যথোপযুক্ত ‘শব্দ’ চয়নের মাধ্যমে ‘সম্বোধন’ করুন। তবে অনেক সময় কিছু শব্দ দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো কাজ করে। যেকোনো বিষয়ের অর্থ নির্ভর করে, তা আমরা কীভাবে গ্রহণ করছি তার ওপর। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি দূর করতে, পড়াশোনায় নিয়মানুবর্তী করতে এবং শারীরিক ফিটনেস বাড়াতে শিক্ষা পরিবারের একজন অভিভাবক তাদের একটি বিশেষ শব্দে সম্বোধন করেছিলেন। শব্দটির উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা পুরোপুরি ইতিবাচক হলেও, দুঃখজনকভাবে এটি নিয়ে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো— আমাদের বাবা-মা, শিক্ষক বা সমাজের দায়িত্বশীল অভিভাবকরা প্রায়শই আমাদের মঙ্গলের জন্য এবং সঠিক পথ দেখাতেই এমন শব্দ ব্যবহার করেন। আমাদের উচিত এই সম্বোধনগুলোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা। আমরা যদি এগুলোকে ভুল বুঝি, তবে জীবনের কঠিন সময়ে তাদের স্নেহ, আশীর্বাদ ও সঠিক পথনির্দেশনা লাভের সুযোগ থেকে নিজেদেরই বঞ্চিত করব।
উদ্বুদ্ধকরণের আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা, কাউকে ছোট করা নয়। তাই সম্বোধন আদর, শাসন কিংবা রূপক যা-ই হোক না কেন— তাতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি থাকা জরুরি; অন্যথায় তা কেবল ক্ষোভ আর দূরত্বের দেয়াল তৈরি করে। বাবা-মায়ের অবুঝ সন্তানকে রেগে গিয়ে ‘গাধা’ বলা এবং পরক্ষণেই মমতায় ‘পাগলা’ বলে বুকে টেনে নেওয়া, কিংবা শিক্ষকদের ক্লাসরুমে ছাত্রদের মনোযোগী করার ছলে ‘গরু-গাধা’ বলে সম্বোধন করা— আমাদের চিরাচরিত সমাজ বাস্তবতারই অংশ, যা মোটেও নেতিবাচক নয়।
তবে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যখন কোনো রূপক বা সম্বোধন ব্যবহার করা হয়, তখন তা ভেবেচিন্তে করা উচিত; কারণ তাদের কথার সামাজিক প্রভাব ব্যাপক। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বা শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর, সংশ্লিষ্টদের এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এ ধরনের শব্দ চয়ন বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকদের সুবিধার্থে ‘অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম’ (Anthropomorphism) ও ‘জুমর্ফিজম’ (Zoomorphism) ধারণা দুটি সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। মানুষের কোনো বৈশিষ্ট্য বা অনুভূতি যখন কোনো প্রাণী, বস্তু বা জড় পদার্থের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকে Anthropomorphism বলে। সহজ কথায়, অমানবীয় কোনো কিছুকে মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং তাতে মানুষের গুণাবলী আরোপ করাই হলো এই প্রক্রিয়া। ‘খরগোশ ও কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা’র গল্পে খরগোশের অহংকার এবং কচ্ছপের ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা—এগুলো সবই মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা প্রাণীদের ওপর আরোপ করা হয়েছে। জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ (Animal Farm) উপন্যাসের চরিত্রগুলো মূলত প্রাণী, কিন্তু তারা আসলে মানুষের রাজনৈতিক চরিত্র, লোভ ও ক্ষমতার লড়াইকে প্রতিনিধিত্ব করে।
আবার মানুষের কোনো বৈশিষ্ট্য যখন পশুর চরিত্রে রূপদান করে প্রকাশ করা হয়, তাকে Zoomorphism বলে। এক্ষেত্রেও সহজভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো। মানুষের চিৎকার বা রাগকে সিংহের ডাকের সাথে তুলনা করে বলা হয়ে থাকে— ‘তিনি সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন’। সুপারহিরো ও ভিলেনদের চরিত্র সৃষ্টিতে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যেমন— ব্যাটম্যান (বাদুড়ের রূপ ও বৈশিষ্ট্য নেওয়া মানুষ), স্পাইডারম্যান (মাকড়সার বৈশিষ্ট্যযুক্ত মানুষ), কিংবা ক্যাটওম্যান ও উলভারিন। এদের রূপ ও শক্তি পশুপাখির অবয়ব থেকে অনুপ্রাণিত।
বিংশ শতকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবিত ব্রয়লার মুরগি মূলত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, অহিংস এবং উৎপাদনশীল জীবনযাত্রার এক চমৎকার ইতিবাচক উদাহরণ। ঘড়ি ধরে খাওয়া, নির্দিষ্ট আলো-বাতাসে থাকা এবং নিয়ম মেনে ডিম দেওয়া এই মুরগিগুলো কোনো প্রকার ঝগড়া-বিবাদ ছাড়াই খাঁচায় থেকে মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, যার সাথে করপোরেট জগতের নিয়মতান্ত্রিক ও পরিশ্রমী কর্মীদের জীবনযাত্রার দারুণ মিল রয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ এই পোলট্রি খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা (৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ব্রয়লারের এই সুশৃঙ্খল গুণ ও বিশাল অর্থনৈতিক অবদানের কারণে একে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘Zoomorphism’ বা মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের রূপক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যাতে সামাজিক কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে।
প্রাণী বনাম সামাজিক প্রতীকী রূপের বৈপরীত্য
কার্ল ইয়ুং-এর অবচেতন আর্কেটাইপ বা সামাজিক প্রতীকী ভাবনার কারণে বাস্তবতার চেয়ে মানুষের কাল্পনিক ধারণা বেশি গুরুত্ব পায়। যেমন— ভেড়া ও বিড়াল মানুষের পরম উপকারী বা নিরীহ হওয়া সত্ত্বেও সমাজে তাদের অধীনস্থ, দুর্বল বা ভীরু মনে করা হয়; অন্যদিকে ক্ষতিকর সিংহ কিংবা শিকারি বাঘকে মানুষ অসীম শক্তি ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। একইভাবে, গাধা অত্যন্ত সতর্ক ও বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও সাহিত্যে ও লোককথায় তা বোকামির প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেখানে ঘোড়াকে শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক ধরা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি শিয়াল, ঈগল ও কুকুরের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। শিয়াল ও ঈগল উভয়ই বুদ্ধিমান শিকারি হলেও, শিয়ালকে ধূর্ত ও ভীরু ভাবা হয় আর ঈগলকে দূরদর্শিতার প্রতীক হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়। আবার, বাংলায় কাউকে ‘কুত্তা’ বা ‘কুকুর’ বললে চরম অপমান হিসেবে গণ্য করা হলেও, ইংরেজিতে ‘You lucky dog’ বা ‘Work like a dog’ বলে প্রশংসা কিংবা বিশ্বস্ততার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। মূলত, সমাজ কোনো প্রাণীর বাস্তব গুণের চেয়ে তার সাথে যুক্ত করা প্রতীকী অর্থ ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিই বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়।
মানুষের মনস্তত্ত্ব বড় জটিল। বিখ্যাত সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং বলেছেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো সে মনে করে যে সে যুক্তি দিয়ে চলে। আসলে মানুষ চলে আবেগ আর অবচেতনের প্রতীকী বিশ্বাস দিয়ে।’ মূলত মানুষ কোনো নির্দিষ্ট শব্দের চেয়ে, সমাজ সে শব্দের সাথে যে অর্থ বা মূল্যবোধ জুড়ে দেয়, তাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।
সময়ের সাথে শব্দের এই অর্থ পরিবর্তনকে ভাষাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘Semantic change’ বা শব্দার্থের বিবর্তন। সমাজ ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে একটি নেতিবাচক শব্দও পরে ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ প্রচুর। যেমন—একসময়ের গালি বা অপমানসূচক শব্দ ‘Geek’, ‘Nerd’ বা ‘Punk’ আজ যথাক্রমে প্রযুক্তিবিদ, মেধাবী গবেষক এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতীক। এমনকি ‘Brave’ শব্দের আদি অর্থ ছিল ‘বর্বর’, যা আজ ‘সাহসী’ অর্থে সম্মানিত। আবার ‘Knight’ শব্দটির অর্থ ‘চাকর’ থেকে বদলে আজ রাজকীয় উপাধিতে রূপ নিয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় শব্দের এই সামাজিক মানোন্নয়নকে বলা হয় ‘Melioration’ বা ‘Amelioration’।
আজ ‘ব্রয়লার’ শব্দটিকে অলস বা কৃত্রিম জীবনযাত্রার প্রতীক হিসেবে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রজন্মের তরুণেরা যদি একাগ্রচিত্তে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও মানবিকতায় এগিয়ে যায়, তবে এই শব্দের সামাজিক মূল্যও বদলে যাবে। ব্রয়লার মুরগি যেমন কম সময়ে দ্রুত বাড়ে, অধিক ডিম দেয় এবং সামাজিক ও অহিংস ঠিক তেমনি আধুনিক যুগে যারা খুব কম সময়ে ক্যারিয়ার বা ব্যবসায় অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করবে, সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবে ভবিষ্যতে হয়তো তাদেরকেই গর্ব করে বলা হবে ‘ব্রয়লার জেনারেশন’। আর তাদের জন্য রইল আমাদের আগাম শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম