১. পরকীয়ার আগাছা সময়মতো পরিষ্কার করা জরুরি
দাম্পত্য জীবনে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা একটি পবিত্র দায়িত্ব। এই বিশ্বাসের ঘাটতি হলেই পরকীয়া নামের ক্ষতিকর অভ্যাসের জন্ম হয়। এটি ঠিক গাছের ওপর জন্মানো পরগাছার মতো। সময়মতো পরগাছা কেটে না ফেললে, তা একসময় মূল গাছ বা ভবনকে ধ্বংস করে দেয়। লোহা পরিষ্কার না রাখলে যেমন মরিচা ধরে, শরীর পরিষ্কার না রাখলে রোগ ছড়ায়, কিংবা ভেজা কাপড় সময়মতো না শুকালে নষ্ট হয়ে যায়; ঠিক তেমনি দাম্পত্য সম্পর্ককেও সবসময় বিশ্বাস দিয়ে আগলে রাখতে হয়। সম্পর্কে বিশ্বাসের যত্ন না নিলে সেখানে পরকীয়া নামের ক্ষতিকর আগাছা বা শেওলা জন্ম নেয়, যা পুরো সংসারকে ছারখার করে দেয়।
২. সচেতনতার মাস্ক ও স্বচ্ছ সম্পর্কের সতর্কতা
সংক্রামক রোগ করোনা থেকে মুক্ত থাকতে যেমন বাইরে বের হলে মাস্ক পরিধান করতে হয়, তেমনি সুখী দম্পতিকে যাতে কোনোভাবে পরকীয়ার ভাইরাস আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য বাইরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক সচেতনতার মাস্ক পরা জরুরি। প্লাস্টিক বোতল, বাটি, ফুলের টব কিংবা এসির পানি যতই পরিষ্কার হোক, তা দীর্ঘদিন জমে থাকলে সেখানে ডেঙ্গুর মশা জন্মাবেই। তেমনি সহকর্মী বা বন্ধুর সাথে সম্পর্ক যতই স্বচ্ছ হোক না কেন, সীমারেখা না মেনে দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকলে ‘পরকীয়া’ নামক ডেঙ্গু জন্ম নিতে পারে। কারণ, পরকীয়ার এডিস মশা অনেক সময় আপাত-পরিষ্কার পরিবেশেই জন্ম নেয়।
৩. দাম্পত্য জীবনে ‘বিশ্বস্ততার মশারি’
ম্যালেরিয়ার জীবাণু শরীরে ঢোকার সাথে সাথেই লক্ষণ প্রকাশ পায় না; মশা ও মানুষের দেহে দুটি চক্র পার করে ১০ থেকে ১৪ দিন পর রোগটি আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু আগে থেকে মশারি ব্যবহার করলে এবং সময়মতো রক্ত পরীক্ষা করালে যেমন ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচা সম্ভব, ঠিক তেমনি দাম্পত্য জীবনে ‘বিশ্বস্ততার মশারি’ ব্যবহার করলে পরকীয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়। ম্যালেরিয়ার শুরুতে রক্ত পরীক্ষার মতোই সম্পর্কে কোনো সন্দেহ বা সমস্যা দেখা দিলে শুরুতেই সচেতন হওয়া জরুরি; এতে রোগচক্রের মতো পরকীয়ার চক্রও আর সামনে এগোতে পারে না।
৪. এক অবিশ্বস্ততায় নিঃশেষ দুটি পরিবার
দুটি পারমাণবিক দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে যেমন উভয় দেশই ধ্বংস হয়ে যায়, তেমনি দুটি বিবাহিত মানুষের মধ্যে পরকীয়া সম্পর্কও উভয় পক্ষের চরম ক্ষতি করে। মুখোমুখি সংঘর্ষে দুটি বাসের চালক ও যাত্রী সবাই যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পরকীয়ার কারণে দুটি পরিবারের বহু মানুষের মান-সম্মান এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যায়। জাহাজের তলার একটি ছোট ছিদ্র যেমন পুরো জাহাজকে সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি অবিশ্বস্ততা দুটি সাজানো সংসারকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। বনের আগুন যেমন সুন্দর একটি বনকে পুড়িয়ে ছাই করে, তেমনি পরকীয়া গোপন আগুনের মতো দুই পরিবারের বহু বছরের সম্মান এক নিমেষে শেষ করে দেয়। নৌকার মাঝি হাল ছেড়ে দিলে যেমন সব যাত্রী ডুবে যায়, তেমনি পরিবারের প্রধান মানুষটি পরকীয়ায় জড়ালে পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
৫. প্রকৃতির দর্পণ: পাখির সমাজেও বিচ্ছেদ ও পরকীয়া
সম্প্রতি রয়্যাল সোসাইটির জার্নাল ‘দ্য প্রসিডিংস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের মতো পাখির সমাজেও পরকীয়া ও বিচ্ছেদের (ডিভোর্স) হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২৩২টি প্রজাতির ওপর গবেষণা চালিয়ে চীন ও জার্মানির বিজ্ঞানীরা দেখেছেন—বাহ্যিকভাবে ৯০% পাখি একগামী মনে হলেও, বংশধরকে আরও শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় করার তাগিদ থেকে স্ত্রী পাখি এবং জিন ছড়ানোর প্রবণতা থেকে পুরুষ পাখি সুযোগ পেলেই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিদের দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্কে (Long-distance relationship) এই বিচ্ছেদ বেশি দেখা যায়।
৬. যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা ও কাঙ্ক্ষিত সঙ্গী হারানোর সংকট
ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পক্ষীবিদ ডক্টর রস ক্রেটারের মতে, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও পরিবেশগত নানা বাধার কারণে বিপন্ন অনেক পাখি তাদের নিজস্ব প্রজাতির ডাক বা গান পর্যন্ত ভুলতে বসেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সঙ্গী নির্বাচনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা তাদের মিলন ও প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে পরকীয়া ও সংসার ভাঙার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৭. ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে ফিজিক্যাল বিপর্যয়
পাখিদের মতো আধুনিক মোবাইল দুনিয়ায় দম্পতিরাও আর নিজেদের মনের কথা পাশাপাশি বসে বলার সময় পাচ্ছে না। একজন আরেক জনের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন কিছুই বুঝতে চাইছে না। মোবাইল নেটওয়ার্ক যেমন পাখির সম্পর্কের বাধার কারণ হচ্ছে, তেমনি সহজলভ্যতার কারণে দম্পতিরা পারিবারিক নেটওয়ার্ক থেকে পরকীয়া নেটওয়ার্কে প্রবেশ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে চ্যাটিং আর টেক্সট মেসেজে কেটে যাচ্ছে সময়; পাশের জনের কী হচ্ছে তা জানার বা বোঝার সময় নেই। ভাঙা হাত জোড়া লাগলেও ভাঙা দাঁত যেমন আর জোড়া লাগে না, তেমনি পরকীয়ায় ভাঙা সংসারও সহজে জোড়া লাগানো যায় না। ভার্চুয়াল সংলাপ একসময় পরকীয়ার ফিজিক্যাল সংলাপে পরিণত হয়ে শান্তির সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাই দাম্পত্য সুখ টেকাতে ভার্চুয়াল ও ফিজিক্যাল জগত সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা আবশ্যক।
৮. পরিসংখ্যানে বিচ্ছেদের আশঙ্কাজনক চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে ডিভোর্স বৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১.৫ গুণ বেশি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই বছরে ডিভোর্সের নোটিশ প্রায় ৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকেই আবেদন বেশি আসছে (নারী ও পুরুষের অনুপাত ৩:৭)। ঢাকা শহরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৫%-৮২% ডিভোর্সের আবেদন নারীদের। ২০২২ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪০টি করে ডিভোর্স নোটিশ রেকর্ড করা হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্টে আরও দেখা যায়, বহু দম্পতি আইনগতভাবে বিচ্ছিন্ন না হয়ে আলাদাভাবে বসবাস করছেন, যাকে ‘শ্যাডো সেপারেশন’ বলা যায়। এছাড়া পরকীয়ার কারণে আত্মহত্যা ও খুনের মতো ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
৯. পরকীয়ার অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরকীয়া ও বিচ্ছেদ কেবল নৈতিক স্খলন নয়; এটি মূলত ‘রিসোর্স ডাইভারশন’ (সম্পদের অপব্যবহার) এবং ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ড্যামেজ’ (মানবসম্পদের ক্ষতি)। পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘অর্থনৈতিক ইউনিট’। পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তি পরিবারে বিনিয়োগযোগ্য সময়, অর্থ ও শ্রম গোপনে একটি ঝুঁকিভিত্তিক দ্বিতীয় খাতে নিয়ে যান, যা মূল পরিবারের সঞ্চয় ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমেরিকান মনস্তাত্ত্বিক সমিতি ও ইনস্টিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজ-এর মতে, পরকীয়া জানাজানি হলে উভয় সঙ্গীর কর্মক্ষমতা ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমে যায়। ‘জার্নাল অব সোশ্যাল অ্যান্ড পার্সোনাল রিলেশনশিপস’ জানায়, বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ পরকীয়া, যার অর্থনৈতিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। বিচ্ছেদের ফলে সম্পদ ভাগ হয়ে যাওয়ায় উভয় পক্ষের জীবনযাত্রার মান ২৫% থেকে ৪৫% পর্যন্ত নেমে যায়। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়ার ব্যয় অর্থনীতিতে একধরনের মূলধন ধ্বংস বা ‘Deadweight Loss’। উপরন্তু, পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বাজে খরচ ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রবণতা বেশি থাকায় পারিবারিক মূলধন দ্রুত নিঃশেষ হয়।
১০. মস্তিষ্কের খেলা ও প্রলোভনের বিজ্ঞান
আমাদের মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অংশটি নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা ও আকর্ষণের প্রথম সংকেত পাঠায়, আর ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি যুক্তি ও নৈতিকতা দিয়ে সেই ক্ষণিকের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে যাদের শরীরে ‘ডোপামিন ডি-৪ রিসেপ্টর’ বা ‘সিকার জিন’ (DRD4-7R) থাকে, তারা সাধারণ জীবনে সহজে তৃপ্তি পায় না এবং তীব্র আনন্দের খোঁজে গোপন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নিউ ইয়র্কের বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, এই জিন বহনকারীদের পরকীয়া করার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সহজ কথায়, যখন মস্তিষ্কের যুক্তির অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জিনের প্রভাবে আবেগের অংশটি জিতে যায়, তখনই মানুষ প্রলোভন সামলাতে না পেরে পরকীয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এটি অনেকটা ব্রেকে পা না দিয়ে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার মতো।
১১. শান্তির সংসারে বিশ্বস্ততাই একমাত্র পথ
পরকীয়া মানুষকে আর্থিক, মানসিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়—এটি ঠিক বিষপানের মতো। সম্পর্কের দড়িটা যদি একদিকে শক্ত আর অন্যদিকে দুর্বল থাকে, তবে সেই ফাঁক দিয়েই পরকীয়া ঢুকে পড়ে। পরকীয়া অনেকটাই দই ভেবে চুন খাওয়ার মতো প্রতারণা। পবিত্র ভালোবাসার চোরাচালান বন্ধ না হলে পরকীয়া বাড়তেই থাকবে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা পরকীয়া পরিত্যাগ করো; কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে—যার তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে।’ তাই পরকীয়াজনিত শাস্তি নয়, বরং বিশ্বস্ততার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সুখী দাম্পত্য জীবনের শান্তিই হোক আমাদের কাম্য।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম