Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

‘কাঠ পেন্সিল’ বিবর্তনের পাঁচশ বছর আজ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৩০ মার্চ ২০২৬ ১৫:১৬

সে এক ঝোড়ো রাতের গল্প। আকাশের বুক চিরে নামা বজ্রপাত আর উন্মত্ত বাতাসের তাণ্ডবে লন্ডভিন্দ ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্ট। জনমানবহীন বোরোডেইল উপত্যকায় বিশালাকায় এক ওক গাছ উপড়ে পড়তেই উন্মোচিত হলো এক আদিম রহস্য। গাছের শিকড়ের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো কুচকুচে কালো, চকচকে এক অদ্ভুত পদার্থ। স্থানীয় মেষপালকরা ভাবল, হয়তো মাটির নিচ থেকে অভিশপ্ত কোনো কয়লা বেরিয়ে এসেছে! কিন্তু পুড়িয়ে দেখা গেল, এতে আগুন ধরে না। বরং পাথরের গায়ে ঘষতেই ফুটে ওঠে নিকষ কালো রেখা। তারা জানত না, প্রকৃতির সেই আকস্মিক তাণ্ডব আসলে পৃথিবীর হাতে তুলে দিয়েছে এক রুপালি জাদুদণ্ড, যার নাম পরে দেয়া হয়েছে ‘পেন্সিল’। সেই অন্ধকার রাতে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা গ্রাফাইটই ছিল সভ্যতার নতুন পাণ্ডুলিপি লেখার প্রথম হাতিয়ার। আর আজ ৩০ মার্চ, সেই হাতিয়ার আবিষ্কারের দিন।

বিজ্ঞাপন

সীসাহীন এক ‘লেড’ পেন্সিলের গোলকধাঁধা

পেন্সিলের ইতিহাস মানেই এক বিশাল বিভ্রান্তির গল্প। আমরা একে ‘লেড’ পেন্সিল বলি, অথচ এর ভেতরে সীসার লেশমাত্র নেই। সেই বোরোডেইল উপত্যকার মানুষ যখন কালো খনিজটি পেল, তারা একে ভেবেছিল এক প্রকার সীসা বা ‘ব্ল্যাক লেড’। সেই ভুল নামটাই ইতিহাসের পাতায় আটকে গেছে শত শত বছর। মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে এই গ্রাফাইটের টুকরোকে ভেড়ার চামড়ায় মুড়িয়ে সরাসরি হাতে ধরে লেখা হতো। হাতে কালি লাগত বলে পরে শুরু হলো কাঠ দিয়ে মোড়ানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেই কাষ্ঠদণ্ডের বিবর্তনই আজ আমাদের হাতে ধরা দেয় আধুনিক পেন্সিল হিসেবে। এই সরু কাঠির ভেতরে লুকিয়ে থাকা গ্রাফাইট দিয়ে আপনি চাইলে অনায়াসেই ৩৫ মাইল লম্বা এক দীর্ঘ রেখা টেনে দিতে পারেন, যা অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে সাগরের দিগন্তরেখা।

একটি প্যাটেন্ট ও একটি অভাবনীয় মিলন

পেন্সিল তো ছিলই, কিন্তু তার মাথায় সেই চিরচেনা লালচে রবার বা ইরেজারটি এলো কবে? দিনটি ছিল ১৮৫৮ সালের ৩০ মার্চ। হেইম্যান লিপম্যান নামের এক প্রতিভাবান উদ্ভাবক ভাবলেন, পেন্সিল দিয়ে তো মানুষ ভুলও করে, তবে মোছার জন্য কেন বারবার পকেটে রবার খুঁজতে হবে? তিনি পেন্সিলের অন্য প্রান্তে একটি ছোট্ট রবার জুড়ে দিয়ে সেটির প্যাটেন্ট করিয়ে নিলেন। এই একটি সাধারণ ভাবনা পেন্সিলকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক শিল্পকলায় পরিণত করল। এই বিশেষ দিনটির কথা মাথায় রেখেই তুরস্কসহ বিশ্বের বহু প্রান্তে পেন্সিলের বহুমুখী ব্যবহারকে উদযাপন করা হয়। ভাবুন তো, লিপম্যানের সেই আইডিয়া না থাকলে আজ কত কোটি কোটি মানুষের ড্রয়িং খাতা ভুল দাগে কলঙ্কিত হয়ে পড়ে থাকত!

ছয় কোণ আর হলুদের রাজকীয় রসায়ন

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, পেন্সিল কেন গোল না হয়ে অধিকাংশ সময় ছয় কোণবিশিষ্ট হয়? এর পেছনে আছে এক মজার প্রকৌশল। গোল পেন্সিল টেবিল থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলেই ভেতরের ভঙ্গুর গ্রাফাইট ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সেই ট্র্যাজেডি রুখতেই পেন্সিলকে দেওয়া হলো হেক্সাগোনাল বা ছয় কোণের বর্ম। এতে পেন্সিল যেমন টেবিলে স্থির থাকে, তেমনি এক টুকরো কাঠ থেকে পেন্সিল কাটার সময় অপচয় হয় সবচেয়ে কম। আর পেন্সিলের সেই চিরচেনা হলুদ পোশাক? সেটিও এসেছে এক দাপুটে আভিজাত্য থেকে। উনিশ শতকে সবচেয়ে সেরা গ্রাফাইট আসত চীন থেকে। চীনারা হলুদকে মনে করত রাজকীয় রঙ। তাই আমেরিকান পেন্সিল কোম্পানিগুলো বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিল; তাদের পেন্সিলও রাজকীয় মানের। সেই থেকে হলুদ রঙটি পেন্সিলের গায়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে লেপ্টে আছে।

ডিজিটাল যুগের একমাত্র অফলাইন সম্রাট

কিবোর্ড, স্টাইলাস আর টাচস্ক্রিনের এই কৃত্রিম যুগেও পেন্সিল কেন আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী? কারণ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রযুক্তি। এর কোনো সফটওয়্যার আপডেট লাগে না, ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। মহাকাশচারীরা যখন শূন্য অভিকর্ষে কলম কাজ না করায় বিপাকে পড়েছিলেন, তখন এই পেন্সিলই ছিল তাদের পরম বন্ধু। এমনকি বরফশীতল এন্টার্কটিকা থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ, সর্বত্রই পেন্সিল সচল। পেন্সিলের ডগা যখন কাগজের বুকে আলতো ঘষা খায়, তখন যে সুক্ষ্ম শব্দ আর গ্রাফাইটের ঘ্রাণ তৈরি হয়, তা কোনো ডিজিটাল স্ক্রিন দিতে পারে না। পেন্সিল কেবল একটি লেখার সরঞ্জাম নয়, এটি মানুষের চিন্তার প্রথম স্ফুলিঙ্গ। আজ যখন আপনি একটি পেন্সিল শার্প করবেন, মনে রাখবেন,আপনার হাতে থাকা ওই ছোট্ট কাষ্ঠদণ্ডটি কয়েক শতাব্দী আগের সেই ঝোড়ো রাতের রহস্য আর কয়েকশ বছরের মানবীয় মেধার এক অমর সংমিশ্রণ।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন