Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যেখানে প্রতি মাসের একটি তারিখে ‘হাসি’ বাধ্যতামূলক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৩১ মার্চ ২০২৬ ২০:০৫

কল্পনা করুন এমন এক জনপদের কথা, যেখানে সূর্য উঠলে আপনাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসতেই হবে। কোনো শোক নয়, কোনো বিরক্তি নয়। পুরো শহরজুড়ে কেবল হাসিমুখের মহড়া। এটি কোনো রূপকথার গল্প কিংবা স্যাটায়ার ধর্মী সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় ইয়ামাগাতা প্রশাসনিক অঞ্চলের (Prefecture) বাসিন্দাদের জন্য এটি এখন এক দাপ্তরিক বাস্তবতা। গত বছর এই অঞ্চলের সরকার একটি অভূতপূর্ব এবং বিতর্কিত আইন পাস করেছে, যার মূল ভিত্তি হলো ‘হাসি’। একজন সাংবাদিক হিসেবে গত তিন দশকে বিশ্বের বহু বিচিত্র আইন দেখেছি, কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকের ব্যক্তিগত আবেগের ওপর এমন ‘সুখকর’ হস্তক্ষেপ সত্যিই বিরল। বিশেষ করে প্রতি মাসের অষ্টম দিনটি এখানে এক বিশেষ ‘হাসি দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইয়ামাগাতা অধ্যাদেশ ও হাসির নেপথ্য বিজ্ঞান

জাপানের ইয়ামাগাতা অঞ্চলের এই আইনটি মূলত একটি স্বাস্থ্য গবেষণার ফসল হিসেবে জন্ম নিয়েছে। ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন দীর্ঘ সময় ধরে ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর একটি গবেষণা চালায়। সেখানে দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত একবার প্রাণ খুলে হাসেন, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি এবং হৃদরোগের সম্ভাবনা যারা হাসেন না তাদের তুলনায় অনেক কম। জাপানের মতো উচ্চমাত্রার কর্মব্যস্ত এবং একাকীত্বের দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়াতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে স্থানীয় রাজনৈতিক দল ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ এই বিলটি উত্থাপন করে। এর মূল লক্ষ্য হলো; নাগরিকদের হাসতে উৎসাহিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা যাতে কেউ গুমোট মুখে বসে না থাকে।

প্রতি মাসের আট তারিখ কেন বিশেষ

ইয়মগাতার এই বিচিত্র আইনের সবচেয়ে মজার অংশ হলো ক্যালেন্ডারের আট তারিখ। প্রতি মাসের অষ্টম দিনটিকে তারা ‘হাসি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। জাপানি শব্দতত্ত্বের গভীর লুকিয়ে আছে এর রহস্য। জাপানি ভাষায় হাসিকে বলা হয় ‘হাহা’ (Haha) কিংবা ‘হাসি’ (Hashi)। অন্যদিকে আট সংখ্যাটিকে বলা হয় ‘হাতি’ (Hachi)। এই শব্দের ধ্বনিগত মিল থেকেই মাসের আট তারিখকে বেছে নেওয়া হয়েছে হাসির আনুষ্ঠানিক দিন হিসেবে। এই দিনে স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয় যাতে সবাই সম্মিলিতভাবে হাসির চর্চা করে। এটি অনেকটা ইয়োগা বা শরীরচর্চার মতো একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

আইন নাকি নিছক অনুরোধের সংস্কৃতি

বিদেশের পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেউ যদি না হাসে তবে কি তাকে জেল বা জরিমানা গুনতে হবে? ইতিহাস ও জাপানি আইন কাঠামোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, জাপান হলো ‘অনুরোধের সংস্কৃতি’র দেশ। ইয়ামাগাতার এই হাসির আইনে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এটি মূলত একটি ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা। কোনো নাগরিক যদি না হাসেন, তবে তাকে পুলিশ ধরবে না। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করা হয়েছে তারা যেন তাদের কর্মীদের হাসিখুশি রাখার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করে। যদিও সমালোচকরা বলছেন, মানুষের আবেগ কখনোই আইনের ফ্রেমে বন্দি করা উচিত নয়, তবুও ইয়ামাগাতা সরকার মনে করে, মাঝেমধ্যে ভালো থাকার জন্য একটু সরকারি ধাক্কার প্রয়োজন আছে।

হাসির আড়ালে লুকানো একাকীত্ব

একজন ইতিহাসবিদের চোখে দেখলে, জাপানের এই হাসির আইন আসলে তাদের গভীর এক সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। জাপানে ‘হিকিকোমোরি’ বা সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ যান্ত্রিক হতে হতে হাসতে ভুলে যাচ্ছে। এর আগে আমরা দেখেছি জাপানের ওসাকা কিংবা টোকিওতে ‘লাফটার থেরাপি’র ব্যাপক জনপ্রিয়তা। এমনকি কিছু কোম্পানিতে সকালে কাজ শুরুর আগে ‘স্মাইল ডিটেক্টর’ যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হয়, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা হয় হাসিটি কতটা নিখুঁত। ইয়ামাগাতার এই আইনটি সেই যান্ত্রিকতা থেকে মানুষকে বের করে এনে একটি সুস্থ জীবনধারা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি সরকারি প্রয়াস মাত্র।

বিশ্বের মানচিত্রে হাসির শহর

ইয়ামাগাতা আজ বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনামে কেবল এই আইনের কারণে। পর্যটকরা এখন কৌতূহলী হয়ে এই অঞ্চলে ভিড় জমাচ্ছেন এটা দেখতে যে, সত্যিই মানুষ সেখানে হাসছে কি না। এই আইনটি সফল হোক বা না হোক, এটি একটি বড় বার্তা দিচ্ছে । আধুনিক পৃথিবীতে হাসি এখন আর কেবল স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নয়, এটি একটি প্রয়োজনীয় ওষুধ। পেন্সিল যেমন ভুলের দাগ মুছে দেয়, ইয়ামাগাতার এই হাসির আইনটিও যেন মানুষের জীবনের বিষণ্ণতার দাগগুলো মুছে দেওয়ার একটি ছোট্ট চেষ্টা। হয়তো কোনো একদিন পৃথিবীর প্রতিটি শহরের ক্যালেন্ডারে এমন একটি দিন থাকবে, যেদিন অন্তত আইনের ভয়ে হলেও মানুষ ভুলে যাবে যাবতীয় দুঃখ আর ক্ষোভ। কারণ দিনশেষে, একটি নিখুঁত হাসির চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর দ্বিতীয়টি নেই।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন