Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

৬৪ ঘরের মহাযুদ্ধে রাজাকে বন্দি করার রোমাঞ্চকর দিন আজ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২০ জুলাই ২০২৬ ১৬:৩৫

সামনে সাজানো চৌকো আকৃতির একটি কাঠের বোর্ড। সেখানে মুখোমুখি বসে আছেন দুজন মানুষ। মাঝখানে বোড়ে, হাতি, ঘোড়া আর নৌকার এক বিশাল সৈন্যদল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশ একদম নিথর, শান্ত। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের ভেতরেই চলছে এক রক্তপাতহীন ভয়ংকর যুদ্ধ। একজন সৈন্য এক ঘর সামনে এগিয়ে গেল, ওপাশ থেকে পাল্টা চাল এলো। ব্যস, শুরু হয়ে গেল মগজের তুমুল লড়াই, যেখানে কোনো তলোয়ার ছিটকে পড়ে না, কোনো রক্ত ঝরে না, অথচ একটি ভুল চালে আস্ত একটা রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যায়। এই রোমাঞ্চকর বুদ্ধির খেলাই হলো দাবা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছে। আজ ২০ জুলাই, সারা বিশ্বের কোটি কোটি দাবাড়ু আর সাধারণ মানুষের জন্য এক বিশেষ দিন, কারণ বিশ্বজুড়ে আজ গভীর সম্মানের সঙ্গে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দাবা দিবস। ১৯২৪ সালের এই দিনে ফ্রান্সের প্যারিসে আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা গঠিত হয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালনের প্রথা শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

ভারতবর্ষ থেকে বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য যাত্রা

এই যে চৌষট্টি ঘরের মন্ত্রমুগ্ধকর খেলা, এর শুরুটা কিন্তু কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আধুনিক স্টেডিয়ামে হয়নি। বহু শতাব্দী আগে আমাদের এই ভারতবর্ষেই দাবার আদি রূপের জন্ম হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘চতুরঙ্গ’। প্রাচীন ভারতের সেই চতুরঙ্গ খেলায় চার ধরনের সৈন্য দল থাকত—হাতি, ঘোড়া, রথ আর পদাতিক। সেখান থেকে এই খেলাটি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে পারস্য দেশে, যেখানে এর নাম হয়ে যায় ‘শতরঞ্জ’। কালক্রমে আরবের বণিকদের হাত ধরে খেলাটি একসময় ইউরোপে পৌঁছায় এবং সেখানেই আধুনিক দাবার নিয়মকানুন চূড়ান্ত রূপ পায়। রাজার সুরক্ষার জন্য বিশেষ চাল তৈরি হয়, আর বোড়ে কিংবা সৈন্যদের গতি বাড়ানো হয় যাতে খেলাটি আরও দ্রুত এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে এই প্রাচীন খেলাটি আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের মেধা বিকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মগজের ধার বাড়াতে এক অনন্য দাওয়াই

দাবা কেবল দুটো মানুষের মুখোমুখি বসে সময় কাটানোর কোনো সাধারণ বিনোদন নয়, এটি আসলে মস্তিষ্কের দারুণ এক ব্যায়াম। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যারা নিয়মিত দাবা খেলেন, তাদের স্মৃতিশক্তি অন্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। একটি চাল দেওয়ার আগে প্রতিপক্ষ কী চাল দিতে পারে, তা নিয়ে তিন-চার ধাপ অগ্রিম চিন্তা করতে হয়, যা মানুষের দূরদর্শিতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জীবনের নানা জটিল সমস্যার সমাধান কীভাবে ঠাণ্ডা মাথায় করতে হয়, তা এই চৌষট্টি ঘরের খেলাটি খুব সহজেই মানুষকে শিখিয়ে দেয়। পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়ানো থেকে শুরু করে অবসাদ দূর করতেও দাবার জুড়ি মেলা ভার।

রাজা যখন বন্দি তখন খেলার সমাপ্তি

দাবার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর চূড়ান্ত লক্ষ্যে, যাকে আমরা সবাই ‘কিস্তিমাত’ বা ‘চেকমেট’ নামে চিনি। পুরো খেলায় কতগুলো সৈন্য কাটা গেল কিংবা কার কত ক্ষমতা রইল, তা দিনশেষে মোটেও বড় কোনো বিষয় নয়। বিপক্ষের শক্তিশালী মন্ত্রী বা হাতিকে পাশ কাটিয়ে আসল নজরটা রাখতে হয় সবসময় রাজার ওপর। যখন কোনো এক পক্ষের রাজা এমন এক জায়গায় গিয়ে আটকা পড়ে, যেখান থেকে তার আর পালিয়ে যাওয়ার কোনো পথ থাকে না, তখনই খেলার যবনিকা ঘটে। জীবনের যুদ্ধটাও যেন ঠিক এমন, যেখানে চারপাশের হাজারো ঝামেলার মধ্যেও আসল লক্ষ্যের দিকে চোখ রাখতে হয়। আজকের এই বিশেষ দিনে পরিবারের কাউকে বা কোনো বন্ধুকে সাথে নিয়ে একটুখানি দাবার বোর্ডে মেতে উঠলে মন্দ হয় না।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর