লন্ডনের একটা কনকনে শীতের রাতে এক রেলস্টেশনের বুকস্টলের সামনে মাইলের পর মাইল লম্বা লাইন লেগেছে। শত শত মানুষ জাদুকরের পোশাক পরে, হাতে কাঠের লাঠি নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কারো চোখে ঘুম নেই, সবার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন,সেই চশমা পরা অনাথ জাদুকর ছেলেটি কি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে, নাকি অন্ধকারের কালো জাদুকর লর্ড ভলডেমর্টের জাদুদন্ডের আঘাতে চিরতরে হারিয়ে যাবে। জাদুর দুনিয়ার এই চরম উত্তেজনা আর কোটি কোটি ভক্তের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঠিক আজ থেকে ১৯ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের ২১ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেয়েছিল হ্যারি পটার সিরিজের সপ্তম তথা শেষ বই ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস’। লেখিকা জে কে রাওলিংয়ের কলমের জাদুতে তৈরি হওয়া সেই কাল্পনিক দুনিয়ার সমাপ্তি দেখতে সেদিন গোটা পৃথিবীর মানুষ যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, তা প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
পাগলাটে উন্মাদনায় চব্বিশ ঘণ্টায় এক কোটি বই বিক্রির রেকর্ড
বইটি বাজারে আসার পর বিশ্বজুড়ে যে তুমুল শোরগোল আর হুলস্থুল কাণ্ড ঘটেছিল, তা এর আগে কোনোদিন কোনো উপন্যাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ তো বটেই, নামিদামি সব বুকস্টলের সামনে ভক্তরা আগের দিন রাত থেকে তাঁবু খাটিয়ে বসেছিল যাতে দোকান খোলার সাথে সাথেই জাদুর শেষ খন্ডটি হাতে পাওয়া যায়। আর এই অভূতপূর্ব উন্মাদনার ফলও মিলেছিল হাতেনাতে, কারণ মুক্তির মাত্র প্রথম চব্বিশ ঘণ্টাতেই বিশ্বব্যাপী এই বইটির এক কোটি ১০ লাখ কপিরও বেশি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই হিসেবে এটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লেখায়। একটি সাধারণ গল্পের বইকে কেন্দ্র করে আট থেকে আশি বছর বয়সী মানুষের এমন পাগলামি আধুনিক সাহিত্য জগতে সত্যি এক বিরল ঘটনা।
কঠিন লড়াই শেষে আলোর জয় আর অন্ধকারের অবসান
এই শেষ খন্ডে এসে গল্পের মূল চরিত্র হ্যারি পটার তার বিশ্বস্ত বন্ধু রন আর হারমিওনিকে সাথে নিয়ে ভলডেমর্টের অমরত্বের উৎসগুলো ধ্বংস করার জন্য এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে বের হয়। জাদুর বিদ্যালয় হগওয়ার্টস ছেড়ে তারা যখন সাধারণ মানুষের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন প্রতি পদে পদে তাদের বন্ধুত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। গল্পের একদম শেষ দিকে হগওয়ার্টসের সেই ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বহু প্রিয় চরিত্রের আত্মত্যাগ পাঠকদের চোখের কোণে জল এনে দিয়েছিল। তবে সব বাধা বিপত্তি আর অন্ধকারের কালো শক্তিকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের জয় হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি পটারহেড বা ভক্তদের মনে এক অদ্ভুত শান্তি আর তৃপ্তি দিয়েছিল।
অমর জাদুর জাদুদন্ডের শেষ টানে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী আসন
গল্পের শেষ লাইনে লেখিকা যখন লিখেছিলেন যে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে হ্যারির কপালের সেই কাটা দাগটিতে আর কোনোদিন ব্যথা হয়নি এবং সবকিছু একদম ঠিকঠাক ছিল, তখনই পাঠকেরা বুঝতে পেরেছিল যে একটি সোনালী যুগের অবসান ঘটল। হ্যারি পটার সিরিজের এই শেষ বইটি শুধু একটি কাহিনীর সমাপ্তি ছিল না, এটি ছিল সারা বিশ্বের একটা আস্ত প্রজন্মের শৈশব আর কৈশোরের মধুর সমাপ্তি। আজও যখন কোনো লাইব্রেরির কোণে কিংবা বইয়ের তাকে ধুলো জমা সেই চশমা পরা ছেলেটির ছবি চোখে পড়ে, তখন মুহূর্তেই মন চলে যায় সেই হগওয়ার্টসের জাদুকরী ক্লাসরুমে। ঠিক যেমনটি এক সাক্ষাৎকারে হ্যারির শেষ পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লেখিকা জে কে রাওলিং হেসে উত্তর দিয়েছিলেন যে, পাতা ওল্টানো বন্ধ হলেও জাদুর দুনিয়া সবসময় তার ভক্তদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।