জার্মানির ছোট এক শান্ত শহর হ্যামিলন হঠাত করেই যেন নরক হয়ে উঠেছিল। ঘরবাড়ির কোণ থেকে শুরু করে রান্নাঘর, শোবার ঘর, এমনকি মানুষের পোশাকের ভেতরেও গিজগিজ করছিল কোটি কোটি কালো ইঁদুর। মানুষের খাবারদাবার সাবাড় করে ফেলা সেই ভয়ংকর ইঁদুরের উপদ্রবে যখন গোটা শহর অতিষ্ঠ, ঠিক তখনই শহরের বুকে পা রেখেছিল রঙিন পোশাক পরা এক অদ্ভুত ও রহস্যময় মানুষ। ঠোঁটে একটি কাঠের বাঁশি চেপে সে এমন এক সুর তুলল, যা শুনে শহরের সমস্ত ইঁদুর যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল এবং একসময় সব ইঁদুর নদীতে ডুবে মরল। জার্মানির সেই বিখ্যাত হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার ঐতিহাসিক ও রহস্যময় ঘটনাটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর ২২ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব ইঁদুর শিকারি দিবস’ বা ‘র্যাট ক্যাচার্স ডে’। ১২৮৪ সালের এই দিনে হ্যামিলন শহরকে ইঁদুরের হাত থেকে মুক্ত করার সেই রূপকথা ও ইতিহাসের মেলবন্ধনকে ঘিরেই মূলত এই অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় দিনটির উৎপত্তি।
টাকার লোভে চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ট্র্যাজেডি
হ্যামিলন শহরকে ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচানোর পর জাদুকরী সেই বাঁশিওয়ালা যখন মেয়রের কাছে তার পাওনা পুরস্কার দাবি করল, তখন শহরের কর্তাব্যক্তিরা লোভের বশে তাকে টাকা দিতে অস্বীকার করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে সেই রঙিন পোশাকের মানুষটি ঠিক ২২ জুলাই তারিখে আবারও হ্যামিলন শহরে ফিরে আসে এবং তার জাদুকরী বাঁশিতে এক নতুন সুর বাজায়। এবার আর ইঁদুর নয়, সেই সুরের মায়ায় মজে শহরের ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুরা ঘর থেকে বেরিয়ে তার পেছনে হাঁটতে শুরু করে। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, সেদিন শহরের মোট ১৩০ জন শিশু সেই বাঁশিওয়ালার সাথে এক অজানা পাহাড়ের গুহায় হারিয়ে গিয়েছিল, যাদের আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। রূপকথা মনে হলেও জার্মানির হ্যামিলন শহরের পুরনো নথিপত্রে এই নিখোঁজ হওয়ার তারিখটি ২২ জুলাই হিসেবেই লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।
সভ্যতার আড়ালে থাকা এক অতি জরুরি পেশার সম্মান
আজকের আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে এই দিনটি কেবল হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প মনে করিয়ে দেয় না, বরং এটি আমাদের সমাজ ও সভ্যতার এক অতি প্রয়োজনীয় পেশাকে সম্মান জানানোর দিন। আপাতদৃষ্টিতে ইঁদুর ধরা বা পেস্ট কন্ট্রোলের কাজটিকে অনেকে ছোট করে দেখলেও, প্লেগের মতো মহামারী থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য বাঁচাতে এই পেশার মানুষদের অবদান অনস্বীকার্য। বড় বড় শপিং মল, খাদ্য গুদাম কিংবা আধুনিক কলকারখানাকে পরিষ্কার ও রোগমুক্ত রাখতে যারা দিনরাত পর্দার আড়ালে কাজ করে যান, তাদের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক দারুণ সুযোগ এনে দেয় এই দিনটি। প্রাচীনকালের সেই লাঠি হাতে ইঁদুর শিকারি থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক রাসায়নিক ব্যবহারকারী কর্মী—সবাই যেন এই দিবসের মূল নায়ক।
ইতিহাসের সেই রহস্যময় সুরের টানে জীবনের এক বড় শিক্ষা
বাঁশিওয়ালার সেই জাদুকরী সুরের শেষ টানটি আমাদের সভ্যতার ইতিহাসের পাতায় এক গভীর নৈতিক শিক্ষা দিয়ে গেছে, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করলে যে কতটা চড়া মূল্য চোকাতে হতে পারে, হ্যামিলনের সেই ট্র্যাজেডি আমাদের ঠিক সেটিই মনে করিয়ে দেয়। আজ বিশ্ব ইঁদুর শিকারি দিবসে হ্যামিলনের সেই ঐতিহাসিক কাহিনীর ছলে আমরা যেমন রহস্যের রোমাঞ্চ উপভোগ করি, তেমনি আমাদের চারপাশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষাও পাই। তাই পাতা ওল্টানো রূপকথার গল্পের মতোই, জীবনের চলার পথে দেওয়া কথা রাখার গুরুত্ব আর পর্দার আড়ালের নায়কদের সম্মান জানানোর বার্তা ছড়িয়েই শেষ হয় এই বিচিত্র ও জাদুকরী দিনটি।