সাদা চুলে রূপালী আভা, কপালে হালকা ভাঁজ । চোখে চশমা। তার হাসির সামনে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন এক নিমেষে ম্লান হয়ে যায়। কখনো কখনো ঘরের এক কোণে বসে যিনি পরম মমতায় সুতোর পর সুতো বুনে নকশিকাঁথা তৈরি করেন। কিংবা রান্নাঘর থেকে যার হাতের তৈরি পায়েসের মিষ্টি সুবাস পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। তিনিই হলেন আমাদের দাদি বা নানি। বয়স কেবল একটা সংখ্যামাত্র আর মনের দিক থেকে তারা যে আজও কতটা সতেজ, প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়, তা মনে করিয়ে দিতেই প্রতি বছর ২২ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘দাদি-নানি দিবস’ বা ‘গর্জিয়াস গ্র্যান্ডমা ডে’। ২০০৫ সালে অ্যালিসন সাউথউড নামের এক মার্কিন নারী এই দিবসের সূচনা করেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বয়সের ফ্রেমে বন্দি না থেকে প্রবীণ নারীদের ভেতরের চিরতরুণী রূপ ও আত্মবিশ্বাসকে সবার সামনে উদযাপন করা।
গল্পের ঝুড়ি আর পরম মমতার এক জাদুকরী নিরাপদ আশ্রয়
শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রূপকথার সেই ডালিমকুমার আর সুয়োরানি-দুয়োরানির গল্প, যা রাতের পর রাত দাদি বা নানির কোল ঘেঁষে শুয়ে আমরা শুনতাম। বাবা-মায়ের বকুনি থেকে বাঁচতে ঘরের যে মানুষটির পেছনে গিয়ে লুকোলে এক সেকেন্ডে সব ভয় কর্পূরের মতো উড়ে যেত, সেই পরম নিরাপদ আশ্রয়টি হলেন তাঁরা। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন তাঁদের সেই চুলে পাক ধরা অভিজ্ঞ হাত দুটো মাথার ওপর আশীর্বাদ হয়ে নেমে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত মানসিক চাপ দূর করে দেয়। একটি পরিবারের শিকড়কে শক্ত করে ধরে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ পৌঁছে দিতে এই দাদি-নানিদের ভূমিকা সত্যিই অতুলনীয়।
জীবনের নতুন ইনিংসের জয়গান
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে চমৎকার দাদি বা নানি বলতে কেবল ঘরের কোণে বসে থাকা কোনো বৃদ্ধাকে বোঝায় না, বরং আধুনিক যুগের দাদি-নানিরা রীতিমতো ফ্যাশনেবল এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন। চুলে রূপালী রঙের ফ্যাশন, চোখে স্টাইলিশ চশমা আর মুখে এক চিলতে অমলিন হাসি নিয়ে তাঁরা যেভাবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তা তরুণ প্রজন্মকেও অনুপ্রেরণা জোগায়। অনেকেই এই বয়সে এসে নতুন করে পড়াশোনা করছেন, কেউ কেউ আবার মেতে উঠছেন নানা ধরণের সামাজিক কাজে কিংবা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের দুনিয়া সামলাচ্ছেন। জীবনের নানা ঝড়-ঝাপটা পার করে এসেও তারা যেভাবে নিজেদের গুছিয়ে রেখেছেন, সেই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকে কুর্নিশ জানানোর দিন আজ।
প্রিয় হাসির মুখে একটুখানি আনন্দের ছোঁয়া দেওয়ার সেরা সুযোগ
বছরের অন্য দিনগুলো নানা কাজে কেটে গেলেও আজকের এই বিশেষ দিনটি ঘরের এই সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির মুখে একটুখানি বাড়তি হাসি ফোটানোর এক দারুণ সুযোগ এনে দেয়। দাদি বা নানির পছন্দের কোনো শাড়ি উপহার দেওয়া, তাঁর হাতের স্পেশাল রান্নাটি মন ভরে খাওয়া কিংবা পুরোনো দিনের কোনো অ্যালবামের পাতা উল্টে তার তরুণী বয়সের গল্প শোনা,এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাঁদের জীবনকে পরম শান্তিতে ভরিয়ে দেয়। আমরা যতই বড় হই না কেন, তাদের স্নেহের আঁচলের তলার সেই ছোট্ট শিশুটিই থেকে যাই, যা আমাদের জীবনের অন্যতম এক পরম পাওয়া। তাই স্নেহের সেই জাদুকরী স্পর্শ আর চিরসবুজ স্মৃতির চাদরে মোড়ানো প্রিয় মুখগুলোর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়েই শেষ হয় মনের দিক থেকে গর্জিয়াস বা চমৎকার থাকা নারীদের এই বিশেষ দিনটি।