Sunday 26 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বাস নম্বর ৩৭৫-এর রহস্য আজও অজানা পৃথিবীতে

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৬ জুলাই ২০২৬ ১৬:৫২

বেইজিংয়ের বুক চিরে ছুটে চলা ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। কনকনে ঠাণ্ডা আর ঘন কুয়াশায় চারপাশটা প্রায় জনমানবহীন। বেইজিংয়ের ‘সাউথ ইউয়ান’ বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রী নিয়ে ছাড়ল ৩৭৫ নম্বর রুটের শেষ নৈশবাসটি। গন্তব্য ফ্রেগ্রেন্ট হিলস (Fragrant Hills)। বাসের চালক আর কন্ডাক্টর ছাড়া ভেতরে যাত্রী মোটে তিনজন। কিন্তু কেউ কি জানত, এই সাধারণ বাসটিই কয়েক মিনিটের মধ্যে চিনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং হাড়হিম করা এক রহস্যের ট্র্যাকে উঠে পড়তে যাচ্ছে?

চীনে এই ঘটনাটি ‘দ্য মিডনাইট বাস’ বা ‘দ্য লাস্ট বাস টু ফ্রেগ্রেন্ট হিলস’ নামে পরিচিত। এটি কি আসলেই সত্য ঘটনা? চলুন, রহস্যের কুয়াশা ভেদ করে জানা যাক এর ভেতরের আসল সত্য এবং সেই রাতের গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্পটি।

বিজ্ঞাপন

রহস্যের শুরু: মাঝরাতের সেই অদ্ভুত তিন যাত্রী

গল্পের সূত্রপাত ১৯৯৫ সালের ১৪ নভেম্বর। বাসটি যখন টার্মিনাল ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে ‘ইউয়ান-মিং-ইউয়ান’ (পুরনো সামার প্যালেস) স্টেশনের কাছে পৌঁছায়, তখন চালক লক্ষ্য করলেন রাস্তার পাশে দুজন মানুষ হাত তুলছেন। বাস থামানো হলো। কিন্তু দরজা খুলতেই কন্ডাক্টর ও চালকের চোখ কপালে উঠল।

বাসে উঠলেন দুজন নয়, তিনজন যাত্রী! দুপাশে থাকা দুজন মানুষ মাঝখানের একজনকে কাঁধে ভর দিয়ে ধরে রেখেছিলেন। আরও অদ্ভুত বিষয় ছিল তাদের পোশাক। আধুনিক চিনের সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তারা তিনজনই পরে ছিলেন কিং রাজবংশের (Qing Dynasty) আমলের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় লম্বা চোগা (Robes), আর তাদের মুখ ছিল চুনকাম করার মতো সাদা ও ফ্যাকাশে। বাসের বাকি যাত্রীরা ভয় পেয়ে গেলে কন্ডাক্টর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বললেন, ‘ভয় পাবেন না, এরা হয়তো কাছাকাছি কোনো শুটিং সেট থেকে কস্টিউম না কেটেই চলে এসেছেন।’

বৃদ্ধার তীক্ষ্ণ চোখ এবং এক তরুণকে বাঁচানোর নাটক

বাস এগিয়ে চলল। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে একজন বৃদ্ধা আর একজন তরুণ ছিলেন। বৃদ্ধা ক্রমাগত পেছনের সিটে বসা সেই তিন রহস্যময় যাত্রীর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই বাসের ভেতর বাতাস যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং এক অদ্ভুত পচা গন্ধ ছড়াতে লাগল।

পরের স্টেশনে আসার ঠিক আগে, বৃদ্ধা হঠাৎ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। তিনি পাশের তরুণটির কলার চেপে ধরে দাবি করলেন, তরুণটি নাকি একটু আগে তার পার্স থেকে টাকা চুরি করেছে! তরুণটি অবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে চুরির কথা অস্বীকার করল। কিন্তু বৃদ্ধা কিছুতেই থামলেন না, তিনি বাসের চালককে বাধ্য করলেন বাস থামাতে, যাতে তারা নেমে পুলিশ স্টেশনে যেতে পারেন। বাস থামতেই বৃদ্ধা তরুণটিকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে বাস থেকে নামিয়ে নিলেন। বাসটি আবার অন্ধকার কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।

‘ওরা মানুষ ছিল না, ওদের পা ছিল না!’

বাস থেকে নামার পর তরুণটি রেগে গিয়ে বৃদ্ধাকে বললেন, ‘আপনি মিথ্যা কেন বললেন? আমি তো আপনার পার্স ছুঁইওনি!’

তখন বৃদ্ধা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপানো গলায় বললেন, ‘বাবা, আমি জানি তুমি চোর নও। আমি আসলে তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছি।’ বৃদ্ধা বুঝিয়ে বললেন, বাসটি যখন চলছিল, তখন জানালার বাতাস আর ঝাঁকুনিতে পেছনের ওই তিন অদ্ভুত যাত্রীর রাজকীয় পোশাক কিছুটা ওপরে উঠেছিল। বৃদ্ধা নিচে তাকিয়ে দেখতে পান তাদের কাপড়ের নিচে কোনো পা নেই! তারা শূন্যে ভাসছিলেন! বৃদ্ধা বুঝতে পেরেছিলেন, তারা মানুষ ছিলেন না। আর সেই মরণফাঁদ থেকে তরুণটিকে বের করার জন্যই তিনি চুরির নাটক করেছিলেন। তারা দ্রুত স্থানীয় থানায় গিয়ে বিষয়টি ডায়েরি করেন।

নিখোঁজ বাস এবং তিন দিন পরের বীভৎস আবিষ্কার

পরদিন সকালে ৩৭৫ নম্বর বাসটি আর টার্মিনালে ফিরে আসেনি। চালক, কন্ডাক্টরসহ আস্ত বাসটি গায়েব হয়ে যায়। পুলিশ অনুসন্ধানে নামার পর, ঘটনার ঠিক তিন দিন পর বেইজিং থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে ‘আইস মাউন্টেন’ (Xiangshan) নামক এক জলাশয়ের কাছে বাসটির সন্ধান পায়।

কিন্তু বাসের ভেতরের দৃশ্য দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা স্তব্ধ হয়ে যান। বাসের ভেতরে চালক, কন্ডাক্টর এবং এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় বেরিয়ে আসে—মৃত্যুর সময় মাত্র তিন দিন হলেও, লাশগুলো এমনভাবে পচে গিয়েছিল যেন তারা ৩ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। আরও রহস্যের বিষয় ছিল, বাসের ফুয়েল ট্যাংকে তেলের পরিবর্তে ভর্তি ছিল তাজা রক্ত!

এবার আসল সত্য: এটি কি আসলেই ঘটেছিল?

একটি রোমাঞ্চকর হরর সিনেমার মতো শোনানো এই ঘটনাটি কি আসলেই সত্য? উত্তর হলো: না, এটি কোনো সত্য ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি বেইজিংয়ের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘আর্বান লিজেন্ড’ (Urban Legend) বা শহুরে লোককথা।

বাস্তবে, ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে বেইজিংয়ে ৩৭৫ নম্বর বাসের এমন কোনো নিখোঁজ হওয়ার বা ফুয়েল ট্যাংকে রক্ত পাওয়ার পুলিশি রেকর্ড নেই। বেইজিং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষও এই ধরণের কোনো ঘটনার সত্যতা নাকচ করে দিয়েছে। মূলত ইন্টারনেট এবং চিনের স্থানীয় ফোরামগুলোর মাধ্যমে এই গল্পটি ডালপালা মেলে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এতই জনপ্রিয় হয় যে, পরবর্তীকালে এই গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ কিছু থ্রিলার সিনেমা ও নাটকও তৈরি করা হয়।

আজও বেইজিংয়ের কোনো তরুণ যদি মাঝরাতে ৩৭৫ নম্বর বাসে চড়েন, তবে পেছনের সিটের দিকে তাকালে হয়তো অজান্তেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটি ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। গল্পটি কাল্পনিক হলেও, কুয়াশাঘেরা মাঝরাতের বেইজিংয়ের রাস্তায় সেই কিং রাজবংশের পোশাক পরা তিন যাত্রীর অবয়ব চিনের পপ-কালচারে এক চিরন্তন রহস্যের প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে!

বিজ্ঞাপন

ভারতের সেরা ৫টি সৈকত
২৬ জুলাই ২০২৬ ১৭:৩৮

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর