Sunday 26 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আজ আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফার্স্ট লেডি ইভা পেরনের প্রয়াণ দিবস

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৬ জুলাই ২০২৬ ১৭:০৯

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদের বিশাল বারান্দা। সামনে লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্র, যাদের চোখে জল আর মুখে শুধু একটিই নাম ‘ইভিতা’। পপকর্ন বিক্রেতা বা সাধারণ চাকরানির ঘরের এক হতদরিদ্র মেয়ে যেভাবে নিজের রূপ, গুণ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে কোটি কোটি শোষিত মানুষের হৃদয়ের রানি হয়ে উঠেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। লাতিন আমেরিকার রাজনীতির সেইসব উত্তাল দিনে যিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের গরিব, মেহনতি আর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পরম আশ্রয়, সেই আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ও অত্যন্ত জনপ্রিয় ফার্স্ট লেডি ইভা পেরন (ইভিতা) ১৯৫২ সালের ২৬ জুলাই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার সেই অকাল ও বেদনাদায়ক প্রস্থান পুরো আর্জেন্টিনাকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল, যার শোকের ছায়া আজও দেশটির ইতিহাসের পাতায় দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্যের অন্ধকার গলি থেকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ

১৯১৯ সালে এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ইভার শৈশবটা মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে থিয়েটার আর সিনেমার জগতে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে তিনি গ্রাম ছেড়ে বুয়েনস আইরেসে চলে আসেন এবং কঠোর সংগ্রামের পর একজন সফল রেডিও ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর ১৯৪৪ সালে এক চ্যারিটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা হুয়ান পেরনের সাথে তার পরিচয় হয়, যা পরবর্তীতে এক ঐতিহাসিক প্রেমে রূপ নেয়। হুয়ান পেরন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ফার্স্ট লেডি হিসেবে ইভা পেরন ক্ষমতার চিরাচরিত প্রথা ভেঙে সরাসরি রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েন। তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায় এবং আর্জেন্টিনার ইতিহাসে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এক অনন্য ও বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেন, যা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে এক জীবন্ত দেবীতে পরিণত করে।

কোটি ভক্তের চোখের জলে শেষ বিদায়

যখন ইভা পেরনের জনপ্রিয়তা আর ক্ষমতা মধ্যগগনে, ঠিক তখনই তার শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি ক্যানসার। অসুস্থতার চরম মুহূর্তেও তিনি দেশের মানুষের জন্য কাজ করা থামাননি, এমনকি শেষ দিন পর্যন্ত হাসপাতালের বিছানা থেকেই রেডিওর মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুর পর পুরো আর্জেন্টিনা যেন এক গভীর শোকের সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল, কারণ দেশটির ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী কান্না আর দেখা যায়নি। তার মৃতদেহকে মমি করে রাখা হয়েছিল যাতে লাখ লাখ ভক্ত তাদের প্রিয় ‘ইভিতা’কে শেষবারের মতো এক নজর দেখতে পারেন, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ও অভূতপূর্ব ঘটনা।

গানের সুরে চিরকাল অমর হয়ে থাকার এক জাদুকরী আখ্যান

ইভা পেরনের মৃত্যুর এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও বিশ্ব সংস্কৃতির আঙিনায় তার নাম আজও সমানভাবে উজ্জ্বল ও প্রাসঙ্গিক। তার জীবনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তৈরি হয়েছে বিশ্বখ্যাত মিউজিক্যাল নাটক ও হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ইভিতা’, যেখানে তার গাওয়া কালজয়ী গান ‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি আর্জেন্টিনা’ আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের চোখে জল এনে দেয়। ক্ষমতার জাঁকজমক আর সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ছিলেন এই নারী, যিনি খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে এলেও ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়ে গেছেন। মাত্র ৩৩ বছরের এক সংক্ষিপ্ত অথচ ঝোড়ো জীবন পার করে, কোটি কোটি শোষিত মানুষের অধিকারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে এবং ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেই শেষ হয় এই জাদুকরী ফার্স্ট লেডির অমর গল্প।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর