বাবা-মায়ের বকুনি থেকে বাঁচাতে ঘরের কোণে চুপিচুপি ফিসফিসানি, মাঝরাতে লুকিয়ে আইসক্রিম খাওয়া কিংবা ঘরের আসবাবপত্র ওলটপালট করে চোর-পুলিশ খেলার সেই দিনগুলোর কথা মনে করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু চেনা মুখ। তারা আর কেউ নয়, আমাদের মামাতো, খালাতো, চাচাতো কিংবা ফুফাতো ভাই-বোন, যাদের আমরা এক নামে ‘কাজিন’ বলে ডাকি। ভাই-বোনের মতো রক্তের সম্পর্ক আর পরম বন্ধুর মতো মনের মিল। এই দুইয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ লুকিয়ে থাকে এই সম্পর্কের মাঝে। শৈশবের সেই সোনালী স্মৃতি, হাজারো অম্লমধুর খুনসুটি আর সারাজীবনের এই অটুট বন্ধুত্বকে উদযাপন করতে প্রতি বছর ২৪ জুলাই বিশ্বজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হয় ‘জাতীয় কাজিন দিবস’ বা ‘ন্যাশনাল কাজিন ডে’। রক্তের বাঁধন যে কতখানি আনন্দের আর বন্ধুত্বের হতে পারে, তা মনে করিয়ে দিতেই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে।
এক ছাদের নিচে এক জাদুকরী জম্পেশ আড্ডার দুনিয়া
বছরের অন্য দিনগুলো যে যার মতো পড়াশোনা কিংবা কাজে ব্যস্ত থাকলেও, ঈদের ছুটি কিংবা পারিবারিক কোনো বিয়ে বা অনুষ্ঠানে যখন সব কাজিন একসাথে জড়ো হয়, তখন যেন পুরো বাড়ি এক লহমায় জাদুর শহর হয়ে ওঠে। বড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদের কোণে আড্ডা জমানো, নিজেদের ভেতরের গোপন সব প্রেমের গল্প ভাগ করে নেওয়া আর গভীর রাত পর্যন্ত ভূত বা ভূতুড়ে সিনেমার গল্পে মেতে ওঠার আনন্দই আলাদা। ভাই-বোনের চেয়ে তারা একটু আলাদা বলেই তাদের কাছে মনের সব কথা নির্দ্বিধায় খুলে বলা যায়, যেখানে কোনো বিচার পাওয়ার ভয় থাকে না। জীবনের প্রথম আড্ডা, প্রথম আস্থার জায়গা আর প্রথম কোনো দুষ্টুমির সঙ্গী হিসেবে এই কাজিনরাই আমাদের জীবনের প্রথম বন্ধু হয়ে ওঠে।
অটুট রাখার এক দারুণ রসায়ন
সময়ের সাথে সাথে আমরা যখন বড় হয়ে যাই, তখন পড়াশোনা, চাকরি কিংবা বিয়ের কারণে একেকজন একেক শহরে বা ভিন্ন দেশে পাড়ি জমাই। শৈশবের সেই চোর-পুলিশ খেলার দলটা তখন একটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপ মেসেঞ্জারে এসে বন্দি হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বছরের পর বছর দেখা না হলেও যখন কোনো এক ছুটির দিনে হঠাৎ সবার ফোন বা ভিডিও কলে কথা হয়, তখন যেন সেই পুরনো দিনগুলো এক সেকেন্ডে ফিরে আসে। বড় হয়ে যাওয়ার সমস্ত গাম্ভীর্য ভুলে মানুষটি আবারও সেই ১০ বছরের দুষ্টু শিশুটি হয়ে ওঠে, যা প্রমাণ করে যে দূরত্বের দেয়াল যতই বড় হোক না কেন, কাজিনদের ভেতরের সেই আদিম ও খাঁটি রসায়ন কখনো ফিকে হতে পারে না।
ব্যস্ত জীবনের চাকা থামিয়ে স্মৃতিচারণের এক মধুর প্রাপ্তি
আজকের এই বিশেষ দিনটি জীবনের ইঁদুরদৌড় থেকে কিছুটা সময় বের করে নিয়ে সেই পুরনো বন্ধুদের আরেকবার স্মরণ করার এক মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। একটি ছোট্ট খুদে বার্তা পাঠানো, পুরনো কোনো দলবদ্ধ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা কিংবা রাতে সবাই মিলে একটি ভিডিও কলে আড্ডায় মেতে ওঠা, এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই সম্পর্কের সুতোকে আরও মজবুত করে তোলে। জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ে তারা হয়তো সবসময় পাশে থাকতে পারে না, কিন্তু প্রয়োজনের দিনে তারাই সবার আগে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবের সেই চঞ্চলতা আর বর্তমানের এই গভীর ভালোবাসার চাদরে মোড়ানো প্রিয় ভাই-বোনদের প্রতি এক বুক কৃতজ্ঞতা জানিয়েই শেষ হয় আজীবনের এই শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের বিশেষ দিনটি।