মেঘলা আকাশ, ঝুমবৃষ্টি আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা । এই তিনের রসায়ন বাঙালি জীবনে যে কী পরিমাণ ওলটপালট ঘটাতে পারে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে জলছাপ দেখার আকুলতা আর রাস্তায় জমে থাকা জলের প্রাক-ঐতিহাসিক যন্ত্রণা একই সঙ্গে হজম করার মতো অলৌকিক ক্ষমতা আমাদেরই আছে। বৃষ্টির দিনে অফিস ফাঁকি দেওয়ার জন্য হাজারটা জেনুইন বাহানা আবিষ্কার করা থেকে শুরু করে খামখেয়ালি মনকে এক নিমেষে রোমান্টিক বানিয়ে ফেলা। আজ ২৯ জুলাই ‘ন্যাশনাল রেইন ডে’ মানেই অদ্ভুত এক জাদুকরী অধ্যায়। কাজের চাপ আর শহরের যান্ত্রিকতার মুখ কাচুমাচু করে হঠাৎ যখন আকাশের নীল রঙটা নিকষ কালো হয়ে আসে, তখন মনের গতিপথটাই আসলে এক ঝটকায় থমকে যায়।
২৯ জুলাই ‘ন্যাশনাল রেইন ডে’: ইতিহাস ও উদযাপন
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের ‘হিয়ারিন ড্রায়ার কোম্পানি’র প্রেসিডেন্ট ক্লারেন্স ব্লুমফিল্ড প্রথম এই দিনটি উদযাপনের উদ্যোগ নেন। কানসাসের খরাপ্রবণ আবহাওয়ায় বৃষ্টির গুরুত্ব বোঝাতে এবং অনাবৃষ্টির দিনে বৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি জুলাই মাসের শেষের এই সময়টিকে বেছে নেন। পরে ২০০৩ সালে সরকারিভাবে দিনটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বিশেষ দিন হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।
কিন্তু রেইন ডে পালনের আসল মজাটা কোথায় জানেন? এই দিন উদযাপনের জন্য আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই! যদি ঝুমবৃষ্টি নামে, তবে তো কথাই নেই; আর যদি আকাশ খটখটে রোদে পুড়তে থাকে বা এক ফোঁটা মেঘের দেখা না-ও মেলে, তবুও ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের দিনটি পালনের উপায় হাজারটা। অনাবৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে একটু নস্টালজিক হওয়া, ঘরে বৃষ্টির শব্দ বা সাউন্ডট্র্যাক বাজিয়ে কফির কাপে চুমুক দেওয়া, কিংবা মন খারাপের মেঘগুলোকে অন্তত কল্পনার বৃষ্টিতে ধুয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই রেইন ডে-র আসল উদযাপন সম্পন্ন হয়।
খিচুড়ি আর ডিম ভাজার সাথে বৃষ্টি সম্পর্কের রহস্য
বৃষ্টির জলের প্রথম ফোঁটাটা মাটিতে পড়ার আগেই বাঙালির রান্নাঘরে তেল গরম হওয়ার শব্দ পাওয়া যায়। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় অন্য সব পুষ্টিকর খাবারকে একপাশে সরিয়ে চাল আর ডালের এই চিরায়ত মিলন কেন যে এত অদ্ভুত সুস্বাদু হয়ে ওঠে, তা আজও এক পরম রহস্য। সঙ্গে যদি থাকে মুচমুচে ডিম ভাজা, ইলিশ মাছের টুকরো আর এক ফালি লেবু, তবে তো কথাই নেই। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার তোয়াক্কা না করে বাঙালি আজও বিশ্বাস করে, বৃষ্টির দিনে চাল-ডালের গরম ধোঁয়া শুধু পেট ভরায় না, বরং মন খারাপের যাবতীয় কালো মেঘকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। আবহাওয়ার এই মেজাজ বদলের সুযোগে বাঙালির ডায়েট চার্ট যে কোথায় হারিয়ে যায়, সে হিসাব কোনো ক্যালরি মিটারে ধরা পড়ে না।
অফিস যাওয়ার বদলে কাঁথা মুড়ি দেওয়ার মহা উপাখ্যান
ঝুমবৃষ্টির সকালে ফোনের অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে হওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। জানলার কাচে পানির ফোঁটা আছড়ে পড়ার শব্দের মধ্যে এক ধরণের ঘুমপাড়ানি সুর লুকিয়ে থাকে, যা মানুষকে টেনে বিছানার গভীর ভালোবাসায় আটকে রাখে। অফিসে লেট অ্যাটেনডেন্সের ভয় কিংবা বসকে কী অজুহাত দেওয়া যায় সেই চিন্তাকে একপাশে সরিয়ে রেখে, এমন দিনে অলসতার চেয়ে বড় কোনো পরম সত্য হতে পারে না। ট্রাফিকের জলজট আর রিকশাওয়ালার হাঁকাহাঁকিয়ে চরম হাঁসফাঁস দশায় পড়ার আগেই কাঁথা কিংবা হালকা কম্বলটা গ গায়ে জড়িয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে নেওয়ার যে তৃপ্তি, তার কাছে পৃথিবীর সব ধনসম্পদও যেন এক নিমিষে ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
সামাজিক মাধ্যমে বৃষ্টি নিয়ে পোস্ট দেওয়ার মহোৎসব
বৃষ্টি নামতে না নামতেই ঘরের জানলা দিয়ে জলপতনের ছবি আর মেঘলা আবহাওয়ার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢালতে শুরু করে অনুসারীরা। ব্যাকগ্রাউন্ডে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা অরিজিতের কোনো বিষাদময় গানের রিল বানিয়ে পোস্ট না করলে নাকি বৃষ্টি আসার পুরো প্রক্রিয়াটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কফি কাপের ধোঁয়া আর মেঘলা জানলার ছবির সাথে রবি ঠাকুরের দু-লাইন কবিতা জুড়ে দিয়ে নিজেকে রাতারাতি গভীর কবি বা লেখক হিসেবে জাহির করার এই ধারা এখন বাঙালির জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কার কত বেশি বৃষ্টিপ্রেম আর কে কতটা বিষাদগ্রস্ত, তা লাইক আর মন্তব্যের সংখ্যা দেখে মাপার এই আধুনিক খেলা বৃষ্টির আনন্দকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কাদাজল আর কঠিন বাস্তবতা
তবে মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হতেই কিংবা বাস্তবতার অফিসে ঢোকার বেল বাজতেই কল্পনার সব রঙিন ফানুস এক লহমায় ফেটে চুরমার হয়ে যায়। রোমান্টিক কবিতার লাইনগুলো হারিয়ে গিয়ে সামনে ফুটে ওঠে হাঁটু জল, নোংরা কাদা আর তীব্র ট্রাফিক জ্যামের নির্মম বাস্তবতা। ভিজে জবজবে জামাকাপড় নিয়ে কাদা জল ডিঙিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর কিংবা অফিসের চেয়ারে বসে ড্রায়ারে প্যান্ট শুকানোর লড়াই শুরু হতেই একটু আগের মনোরম অনুভূতি নিমেষেই উধাও হয়ে যায়।
এভাবেই একটা রেইন ডে বাঙালিকে একই সাথে মেঘের ওপরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার পরক্ষণেই থাস করে মাটির কঠিন বাস্তবতার ওপর এনে আছড়ে ফেলে দেয়।
তবে আজ?
তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়াল? আকাশ ভাঙুক কিংবা রোদে চামড়া পুড়ে ছারখার হোক, বাঙালির প্রেম কিন্তু থেমে থাকে না। বৃষ্টি হলে খিচুড়ির ধোঁয়া আর কাদা জলের যুদ্ধ, আর না হলে ‘ইশ, যদি আজ বৃষ্টি হতো!’ বলে এক কাপ চায়ে নস্টালজিয়ার চুমুক। কারণ দিনশেষে, কাজের ঠেলায় ভিজে ভূত হয়ে অফিসে হাজিরা দেওয়া বাঙালিও জানে, পকেটে যতই কাজের চাপ আর রাজপথে যতই জলজট থাকুক, জানলার কাচে দু-ফোঁটা জলের দাগ দেখলেই আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কবি আর প্রেমিকের কোনো ছুটির দরকার হয় না!