Wednesday 29 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

একটি চিঠির গোপন রহস্য ও চার্চের শত বছরের শিশু নির্যাতনের সত্য উদঘাটন

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৯ জুলাই ২০২৬ ১৮:১১

১৯৬২ সালের কথা। ভ্যাটিকান থেকে পৃথিবীর সব বিশপের কাছে পাঠানো হলো একটি অতি গোপন নথি, যার নাম ছিল ‘ক্রাইমেন সলিসিটেশনিস’। সহজ কথায়, এটি ছিল এক চরম গোপনীয়তার আদেশ। কোনো যাজকের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সেই তদন্তের পুরো প্রক্রিয়াটি রাখতে হতো একদম গোপন। অভিযোগকারী, সাক্ষী কিংবা তদন্তকারী,কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। মুখ খুললেই ছিল চার্চ থেকে সোজা বহিষ্কারের শাস্তি। ২০০১ সালে কার্ডিনাল জোসেফ রাৎসিঙ্গার, যিনি পরবর্তীতে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট হয়েছিলেন, এই নিয়মটিকে আরও কড়া করে দেন। বাইরে থেকে বলা হতো এটি করা হয়েছে অভিযুক্তের সম্মান রক্ষা ও সাক্ষীর নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের আড়ালে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল হাজার হাজার অসহায় শিশুর আর্তনাদ।

বিজ্ঞাপন

শাস্তির বদলে এক শহর থেকে অন্য শহরে বদলির খেলা

২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন গ্লোব পত্রিকার একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিকের হাত ধরে এই গোপন দেয়াল প্রথম ভাঙতে শুরু করে। জন গিহান নামের এক যাজকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে তারা এক অবিশ্বাস্য ও ভয়ানক সত্যের মুখোমুখি হন। তিরিশ বছরের ক্যারিয়ারে ওই যাজক অন্তত ছয়টি প্যারিশে কাজ করেছেন। ১৯৮২ সালেই প্রথম এক পরিবার তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে। ১৯৮৪ সালে বোস্টনের নতুন আর্চবিশপ কার্ডিনাল বার্নার্ড ল তাকে ওই জায়গা থেকে সরিয়ে দেন ঠিকই, কিন্তু বরখাস্ত না করে দুই মাসের মধ্যে বসিয়ে দেন নতুন আরেকটি প্যারিশে। সেখানে তাকে উল্টো তিনটি যুব সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার মধ্যে ছিল ছোট শিশুদের দলও। অন্য এক বিশপ এতে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কাজ হয়নি। অবশেষে ১৯৯৮ সালে, প্রথম অভিযোগের দীর্ঘ ষোলো বছর পর তাকে বহিষ্কার করা হয়। ততদিনে অন্তত ১৩০ জন মানুষ সামনে এসে অভিযোগ করেন যে শৈশবে তারা এই যাজকের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ছিল মাত্র চার বছর। অভিযোগ উঠলেই চুপচাপ অন্য এলাকায় বদলি করে দেওয়া এই একই নিয়মে অপরাধীরা বছরের পর বছর পার পেয়ে গিয়েছে।

গবেষকদের নথিপত্রে বেরিয়ে এলো পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র

বিষয়টি কেবল দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং পুরো ব্যবস্থার ভেতরেই এটি গেঁথে গিয়েছিল। ২০০৪ সালে মার্কিন বিশপদের অনুরোধেই জন জে কলেজের গবেষকরা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ১৯৫০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন মোট যাজকের প্রায় চার শতাংশ, অর্থাৎ ৪,৩৯২ জন যাজকের বিরুদ্ধে ১০,৬৬৭ জন শিশুর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। এসব ভুক্তভোগীর চল্লিশ শতাংশেরই বয়স ছিল ১১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য আসে ২০১৮ সালে পেনসিলভানিয়া রাজ্য থেকে। গ্র্যান্ড জুরির নয় বছরের তদন্তে দেখা যায়, বিগত সত্তোর বছরে অন্তত ৩০১ জন যাজক পরিকল্পিতভাবে শিশুদের নির্যাতন করেছেন এবং নথিভুক্ত শিকারের সংখ্যা ছিল অন্তত এক হাজার। তদন্তকারীরা পরিষ্কারভাবে জানান, আসল সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি, কারণ বহু ঘটনার কোনো নাম-নিশানাই খাতায় রাখা হয়নি। সেখানকার অ্যাটর্নি জেনারেল পুরো বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তিনটি কথায়—নির্যাতন, অস্বীকার এবং ধামাচাপা।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক অভিন্ন কষ্টের গল্প

যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে এই তদন্ত যখন অন্য দেশে পৌঁছাল, তখন পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালে ফরাসি ক্যাথলিক চার্চের ওপর প্রকাশিত স্বাধীন সোভে কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৫০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত দুই লাখ ষোলো হাজার শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর অন্যান্য কর্মী মেলালে এই সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়ায় অবিশ্বাস্য তিন লাখ তিরিশ হাজারে। ১৭৯১ সালের পর প্রকাশিত এক তদন্তে জানা যায়, ২০০০ সাল পর্যন্ত চার্চের মনোভাব ছিল ভুক্তভোগীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুর উদাসীনতা। অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল কমিশন জানায়, সেখানকার সাত শতাংশ যাজকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এবং একেকটি ঘটনা প্রকাশ পেতে সময় লেগেছিল গড়ে ৩৩ বছর। অর্থাৎ দশ বছরের শিশুটি যখন প্রথম তার কষ্টের কথা কাউকে বলতে পেরেছে, ততদিনে তার বয়স ৪৪ বছর পার হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডের ২০০৯ সালের রায়ান রিপোর্ট বলছে, চার্চ পরিচালিত আবাসিক স্কুলে পাঠোনো এতিম ও দরিদ্র পরিবারের ৩০ হাজার শিশুর ওপর নিয়মিত এমন নির্যাতন চালানো হতো।

সর্বোচ্চ ক্ষমতার দাপট আর অন্ধ বিশ্বাসের প্রাচীর ভাঙার গল্প

এই ভয়াবহ গল্পের সবচেয়ে বড় চরিত্র ছিলেন থিওডোর ম্যাককারিক, যিনি ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী কার্ডিনাল এবং ওয়াশিংটনের আর্চবিশপ। দশকের পর দশক ধরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ পর্যায়ে তিনি দাপটের সাথে কাজ করে গেছেন। ২০২০ সালে ভ্যাটিকানের নিজস্ব ৪৬১ পৃষ্ঠার এক রিপোর্টে স্বীকার করা হয়, অন্তত তিনজন বিশপ এবং স্বয়ং পোপ দ্বিতীয় জন পলও ১৯৯৯ সালে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন, তবুও ২০০০ সালে ম্যাককারিককে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তাকে যাজকের দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়, যা ইতিহাসে প্রথম কোনো কার্ডিনালের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। চার্চের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠানের সম্মান বাঁচানোর তাগিদ এবং ‘ক্লেরিকালিজম’ বা যাজকদের সর্বেসর্বা ভাবার সংস্কৃতির কারণেই এই অন্যায় যুগের পর যুগ টিকে ছিল। অবশেষে সাংবাদিকদের সাহসিকতা আর ভুক্তভোগীদের বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের মুখে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পোপ ফ্রান্সিস এই অতি গোপনীয়তার নিয়ম পুরোপুরি বাতিল করেন। হাজার বছরের জমে থাকা অন্ধকার ভেঙে এভাবেই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে শত শত মানুষের সত্য লড়াই।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর