মাঝরাতে কোনো কারণ ছাড়াই যে মানুষটিকে ফোন করে বিরক্ত করা যায়, নিজের চরম গোপন সত্যটি নিশ্চিন্তে খুলে বলা যায় কিংবা যার থালার খাবার না বলে কেড়ে খাওয়ার ভেতরেই পৃথিবীর সব আনন্দ লুকিয়ে থাকে, সেই মানুষটির নামই বন্ধু। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা আর জটিল জীবনের দোলাচলে আমরা হয়তো অনেক সম্পর্ককেই পেছনে ফেলে আসি, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো পথ হারায় না। ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়, কারণ বন্ধুত্বের এই নিঃস্বার্থ বাঁধনই মানুষকে সামাজিক প্রাণীতে রূপান্তর করেছে। জীবনের প্রতিটি কঠিন মোড়ে যে হাতটি কোনো শর্ত ছাড়াই পাশে এসে দাঁড়ায়, তার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে কোনো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারের দরকার পড়ে না ঠিকই, তবে বিশ্বজুড়ে বন্ধুত্বের জয়গান গাইতে এই দিনটির অবদান অপরিসীম।
বন্ধুত্ব দিবসের ভাবনা
বন্ধুত্ব তো আদিকাল থেকেই মানব সভ্যতার সঙ্গে মিশে আছে, কিন্তু দিবস হিসেবে এটি উদযাপনের চিন্তা কীভাবে বিশ্বজুড়ে ডালপালা মেলল, তার ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। বিশ্বখ্যাত উপহার সামগ্রী ও স্মারকপত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হলমার্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল প্রথম ১৯৩০ সালে অগাস্টের শুরুতে বন্ধুত্ব দিবস উদযাপনের প্রস্তাব করেছিলেন, তবে সেই উদ্যোগটি বাণিজ্যিক আখ্যা পেয়ে অনেকটাই থমকে যায়। এরপর ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই রাতের বেলা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের একটি ছোট নদী তীরবর্তী শহরে বন্ধুদের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার সময় প্যারাগুয়েন চিকিৎসক ডক্টর রামোন আরতেমিও ব্রাচোর মাথায় হঠাৎ এক অদ্ভুত ভাবনা আসে। তিনি বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলেন, পৃথিবীর সব বিভেদ ভুলে মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করতে একটি বিশেষ দিন থাকা প্রয়োজন, যা শুধু সখ্য ও ভালোবাসাকে উৎসর্গ করা হবে। সেই রাতেই জন্ম নেয় ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’ নামের একটি সংস্থা, যারা প্রায় পাঁচ দশক ধরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রচারণা চালিয়ে দিনটির বিশ্বজনীন স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়ে।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মোহর ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি
প্যারাগুয়েসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বহু বছর ধরে ৩০ জুলাই বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়ে আসছিল, কিন্তু এটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রতি বছর ৩০ জুলাই বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হবে। জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিসখ্য উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি, মানবগোষ্ঠী ও বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা। তবে মজার বিষয় হলো, জাতিসংঘ ৩০ জুলাই নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশে ঐতিহ্যগতভাবে অগাস্ট মাসের প্রথম রবিবার বন্ধু দিবস উদযাপনের প্রাধান্য দেখা যায়, যার ফলে গোটা সেপ্টেম্বরজুড়ে যেন বন্ধুত্বের একটি দীর্ঘ উৎসব লেগেই থাকে।
ডিজিটাল দুনিয়া থেকে চায়ের কাপের চিরন্তন আড্ডা
কালের বিবর্তনে বিশ্বজুড়ে বন্ধুত্ব প্রকাশের ধরন বদলালেও এর মূল আবেগটি থেকে গেছে আগের মতোই খাঁটি। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে পোস্ট দেওয়া, পুরনো ছবি খুঁজে বের করে সখাকে বার্তা পাঠানো কিংবা মুহূর্তের মধ্যে দূরদূরান্তের বন্ধুকে স্মারক ভিডিও পাঠাবার প্রবণতা ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়েও চায়ের কাপে তুফান তোলা দীর্ঘ আড্ডা, পুরনো বন্ধুদের হঠাৎ মেলা কিংবা একসাথে বসে শব্দ করে হাসার চেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে যে বন্ধুদের সঙ্গে পুরো বছর কথা বলার সময় পাওয়া যায় না, এই একটি বিশেষ দিন তাদেরকে আবার একই সুতোয় বেঁধে দেয় এবং পারস্পরিক মান-অভিমানের জমা বরফ এক নিমেষে গলিয়ে দেয়।
সংসারের ঘানি ঠেলে হঠাৎ থমকে দাঁড়ানোর এক গল্প
জীবন নামক রেসট্র্যাকে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন এক মূহুর্তের জন্য পেছনের দিকে তাকালেই দেখতে পাই আমাদের শৈশব ও কৌশোরের সেই চিরচেনা মুখগুলো। বন্ধু মানে তো কেবল একই সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো বা সিনেমা দেখা নয়; বন্ধু মানে নিজের সমস্ত ব্যর্থতা প্রকাশ করে হালকা হওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে মানুষের ধনসম্পদ বা অর্জনের হিসাব আর তেমন আলো ছড়ায় না, বরং কতজন বিশ্বস্ত হাত আজীবন পাশে থেকে গেল, সেই গণনাটকই জীবনের আসল প্রাপ্তি হয়ে ওঠে। তাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদগুলো কিনে নেওয়ার জন্য কোনো অর্থ লাগে না, লাগে কেবল একটা খোলা মন আর আজীবন পাশে থাকার অটুট অঙ্গীকার।