Sunday 02 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

তুর্কমেনিস্তানের ‘নরকের দরজা’র রহস্য!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৫০

রহস্য আর রোমাঞ্চে ঘেরা পৃথিবীর বুকে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যা প্রথম দর্শনে কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির দৃশ্য বা চলচ্চিত্রের অ্যানিমেশন মনে হতে পারে। তেমনই এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর স্থান হলো তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমির বুকে অবস্থিত ‘দারভাজা গ্যাস ক্রাটার’ (Darvaza Gas Crater) যাকে গোটা বিশ্ব একনামে চেনে ‘নরকের দরজা’ (Door to Hell বা Gates of Hell) হিসেবে।

মরুভূমির ধূ ধূ বালুকাশ্যায়ার মাঝে অবস্থিত এই প্রকাণ্ড গর্তটি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অবিরাম জ্বলছে। কিন্তু কীভাবে সূচনা হয়েছিল এই চিরন্তনী আগুনের? কেনই বা এটি আজও নেভেনি? চলুন জেনে নেওয়া যাক এই অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিস্ময়ের ভেতরের গল্প।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনাবশত জন্ম: ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ভুল

গল্পটির শুরু গত শতকের সত্তর দশকে, যখন তুর্কমেনিস্তান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে একদল সোভিয়েত ভূতত্ত্ববিদ প্রাকৃতিক গ্যাসের খোঁজে কারাকুম মরুভূমিতে অনুসন্ধান কাজ চালাচ্ছিলেন। বিশাল এক ড্রিলিং রিগ বসিয়ে যখন তারা ভূগর্ভে খনন শুরু করেন, তখন তারা ভাবতেও পারেননি মাটির ঠিক নিচেই অপেক্ষা করছে এক বিশাল ফাঁপা গ্যাস গুহা।

ড্রিল করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভূগর্ভস্থ ধসের সৃষ্টি হয়। গবেষকদের ড্রিলিং রিগ ও সমগ্র ক্যাম্পটি মাটির নিচে তলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় প্রায় ২৩০ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট গভীর একটি বিশাল গর্ত বা ক্রাটার। সৌভাগ্যবশত এই দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারাননি, কিন্তু শুরু হয় অন্য এক বড় বিপদ।

কেন আগুন জ্বালানো হয়েছিল?

মাটি ধসে যাওয়ার পরপরই সেই বিশালাকার গর্ত থেকে বিপুল পরিমাণে মিথেন গ্যাস বাতাসে নির্গত হতে শুরু করে। বিষাক্ত এই গ্যাস কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছিল না, বরং কাছাকাছি অবস্থিত গ্রামের অধিবাসী এবং বন্যপ্রাণীদের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল।

ভূতাত্ত্বিকরা হিসাব কষে দেখলেন, এই বিষাক্ত গ্যাসের বিস্তার বন্ধ করার সবচেয়ে দ্রুত ও নিরাপদ উপায় হলো এতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তাদের ধারণা ছিল, জমে থাকা গ্যাস হয়তো কয়েক দিন বা বড়জোড় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং বিপদ কেটে যাবে।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের সেই হিসেব ভুল প্রমাণিত হলো। ভূতাত্ত্বিকরা বুঝতে পারেননি যে মাটির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাসের এই আধারটি কতটা বিশাল! সেই যে ১৯৭১ সালে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরানো হয়েছিল, সেই আগুন আজও নিভে যায়নি।

পৃথিবীর বুকে ‘নরক’: ভৌগোলিক ও দৃশ্যমান বাস্তবতা

রাতের অন্ধকারে যখন কারাকুম মরুভূমির বুক চিরে আগুনের লালচে আভা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন একে সত্যিই অন্য কোনো জগতের প্রবেশদ্বার বলে মনে হয়। গর্তের তলদেশ থেকে ক্রমাগত উঠে আসা আগুনের শিখা এবং ফুটন্ত কাদার মতো বুদ্বুদ এক ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে। বহুদূর থেকেও অনুভূত হয় এর তীব্র উত্তাপ।

এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের জন্যই স্থানীয় মানুষ ও বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি “নরকের দরজা” নামে পরিচিতি পায়।

চরম প্রতিকূলতায় জীবনের সন্ধান

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি শুধুই মৃত্যুপুরী, যেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। তবে প্রযুক্তিবিদ ও অভিযাত্রী জর্জ কুরুনিস (George Kourounis) ২০১৩ সালে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে হিট-প্রুফ সুট পরে এই জ্বলন্ত গর্তের তলদেশে নেমেছিলেন।

তিনি সেখানে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং অবাক করা তথ্য উন্মোচন করেন। চরম উত্তাপ ও মিথেন গ্যাসে ভরা ওই নরককুণ্ডের তলদেশেও বিশেষ এক ধরনের এক্সট্রিমোফাইল ব্যাকটেরিয়ার (Extremophile Bacteria) সন্ধান পাওয়া গেছে, যা উচ্চ তাপমাত্রাতেও বেঁচে থাকতে পারে। এই আবিষ্কার মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এটি বুঝতে সাহায্য করে যে, অন্য কোনো উত্তপ্ত বা প্রতিকূল গ্রহেও জীবনের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব!

পর্যটকদের আকর্ষণ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

বছরের পর বছর ধরে তুর্কমেনিস্তানের মূল পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এই দারভাজা গ্যাস ক্রাটার। প্রতি বছর হাজার হাজার রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটক ও আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী মরুভূমির এই দূরবর্তী অঞ্চলে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটান শুধু এই অভূতপূর্ব দৃশ্যটি স্বচক্ষে দেখার জন্য।

তবে এই অগ্নিকুণ্ডের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিকটি নিয়ে তুর্কমেনিস্তান সরকার বেশ চিন্তিত।

মূল্যবান সম্পদের অপচয়: বিগত ৫০ বছরে বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাস এভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারত।

পরিবেশগত প্রভাব: অব্যাহত মিথেন দহন ও গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন আশেপাশের বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলছে।

এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুর্কমেনিস্তান সরকার এই গর্তের আগুন নিভিয়ে ফেলার বা গ্যাসের বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপায় খোঁজার জন্য বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে। তবে ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর জটিলতার কারণে আজও এটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞানীদের একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত কীভাবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও রহস্যময় বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে—তুর্কমেনিস্তানের ‘নরকের দরজা’ তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। মরুভূমির নির্জনতায় মিটমিট করে জ্বলতে থাকা এই অগ্নিগহ্বর মানব ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ হয়ে আজও টিকে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর