হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন আপনার কাছের বন্ধু বা পরিবারের কেউ অত্যন্ত গম্ভীর মুখে আপনার সামনে এসে হাত দুটি ধরে বলল ‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি’, তবে চমকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক! আপনি হয়তো ভাববেন নিশ্চয়ই কোনো গভীর স্বার্থ লুকিয়ে আছে, নয়তো লোকটির মাথায় কোনো বড় রকমের গোলমাল দেখা দিয়েছে। অথচ প্রতিদিনের এই ব্যস্ততার মাঝে এই অতি সহজ কথাটি আমরা সবচেয়ে কাছের মানুষের মুখেই শুনতে পাই না। ভালোবাসার উদযাপনে প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য বিশেষ দিন থাকলেও, যার সাথে সারাদিন ঝগড়া করে এক টেবিলে ভাত খাই কিংবা যে বন্ধু বিপদের দিনে নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ায়, তাকে কোনোদিন মুখে ফুটে বলা হয় না তার স্থান কতটা গভীরে। ঠিক এই জড়তা ভাঙতেই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এক অনন্য অনুভূতির দিন, যার নাম এস্থার ডে। প্রতি বছর ৩ আগস্ট দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল প্রেমের সম্পর্কেই নয়, বরং বন্ধুত্ব ও পরিবারের প্রতি জমা থাকা ভালোবাসাও খোলা গলায় প্রকাশ করার জন্য একটি বিশেষ দিন খুবই প্রয়োজন।
এক কিশোরীর ইচ্ছে থেকে শুরু হলো এই অদ্ভুত সুন্দর যাত্রা
এই দিবসের গোড়াপত্তন ২০০৭ সালের দিকে, যখন মাত্র ১৬ বছরের এক মার্কিন কিশোরী এস্থার গ্রেস আর্ল থাইরয়েড কর্কটরোগ বা ক্যান্সারের মতো কঠিন ব্যাধির সাথে লড়াই করছিল। তবে অসুস্থতা তার ভেতরের প্রাণবন্ত মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ইন্টারনেট ও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সে যুক্ত হয়েছিল বিশ্বজোড়া বিশাল এক তরুণ নেটওয়ার্কের সাথে, যেখানে তার পরিচয় ও গভীর বন্ধুত্ব হয় জনপ্রিয় লেখক জন গ্রিনের সাথে। ২০১০ সালে যখন এই ছোট্ট মেয়েটির জীবনপ্রদীপ নিভে আসার পথে, তখন জন গ্রিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তার জন্মদিনে সে বিশ্ববাসীকে কীভাবে মনে রাখতে দেখতে চায়। এস্থার কোনো বিশাল উপহার বা আয়োজন চায়নি, সে চেয়েছিল এমন একটি দিন, যেদিন মানুষ কোনো শর্ত ছাড়া তার পরিবার আর বন্ধুদের ভালোবাসার কথা সরাসরি মুখে বলবে। ২০১০ সালের ৩ আগস্ট এস্থার আর্লের মৃত্যুর পর থেকে তার স্মরণে প্রতি বছর উদযাপিত হয়ে আসছে এই অনন্য অনুভূতি প্রকাশের দিনটি। বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টার্স’ বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল এই এস্থার আর্লকেই।
ভালোবাসা মুখে বলার লজ্জা কাটানোর জাদুকরী মন্ত্র
আমরা প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে শত শত বার্তা পাঠাই, সামাজিক মাধ্যমে অজস্র মন্তব্য করি, কিন্তু প্রিয় মানুষটিকে সরাসরি ‘ভালোবাসি’ বলতে গিয়ে আমাদের গলা শুকিয়ে যায়। লজ্জা, ভয় আর অনভ্যাসের দেয়াল তুলে আমরা ভালো লাগাগুলোকে শুধু মনের ভেতরেই বন্দি করে রাখি। এস্থার ডে আমাদের শেখায় সেই দেয়াল ভেঙে ফেলার দারুণ কৌশল। কোনো দামী উপহার কিংবা বিশাল আয়োজনের দরকার নেই; কেবল একটি মুঠোফোনের বার্তা কিংবা সামনাসামনি দাঁড়িয়ে অপ্রস্তুত করেই বলে দেওয়া যায় জমা থাকা মনের কথাগুলো। হয়তো বার্তাটি পেয়ে বন্ধু হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বে, কিংবা মা অবাক হয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখবে আপনার জ্বর এসেছে কি না, কিন্তু দিনশেষে এই অতি সাধারণ কথাটি যে উষ্ণতা তৈরি করবে তা সারা জীবনের স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে থাকবে। নিছক আপনজনের কাছে হৃদয় উন্মুক্ত করার এই চর্চা আমাদের ভেতরের সমস্ত মানস-দূরত্ব মুছে দিয়ে সম্পর্কগুলোকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলে।
ভুল বুঝে দূরে সরে যাওয়ার দিন আজ নয়
তাই আজ যদি আপনার মুঠোফোনটি বেজে ওঠে এবং ওপাশ থেকে কোনো পুরনো বন্ধু হুট করে বলে বসে যে সে আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে, তবে ভুলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করবেন না! কারণ এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ভালোবাসার কথা প্রকাশ করার এক মহতী অনুভূতিরই স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। আগামী দিনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে তা আমরা কেউ আগে থেকে জানি না, তাই মনের কথা প্রকাশ না করে জমিয়ে রাখা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। আজই কোনো প্রকার জড়তা ছাড়া আপন মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরুন কিংবা বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দিন তারা আপনার জীবনে কতটা মহামূল্যবান। কারণ সময় বয়ে গেলে কেবল আমাদের প্রকাশ করা ভালোবাসার কথাগুলোই মানুষের হৃদয়ে টিকে থাকে, আর এভাবেই এস্থার আর্লের মতো একটি ছোট্ট আলোর কণা পৃথিবীর হাজারটা মনকে চিরকাল আলোকিত করে যায়।