ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা সেই পুরানো খেলনাটা কিংবা দেয়ালে আঁকাবাঁকা পেনসিলের আঁচড়গুলো দেখলে কার না মনটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে। কাজের প্রচণ্ড চাপ শেষে বাড়ি ফিরে যখনই কপালে কোনো ছোট্ট রাজপুত্র বা রাজকন্যার আদুরে ছোঁয়া লাগে, সারা দিনের জমে থাকা সব ক্লান্তি আর মানসিক যন্ত্রণা এক নিমেষে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। রক্ত পানি করা পরিশ্রমে তৈরি প্রতিটি দিন তখন হঠাৎ করে ভীষণ সার্থক মনে হয়। বাবা-মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, সবচেয়ে বড় আশ্রয় আর পরম প্রাপ্তি তো তারাই। পৃথিবীর সব নিয়ম, ব্যস্ততা আর কঠিন সত্যের ভিড়েও সন্তানের এক চিলতে নিষ্পাপ মুচকি হাসি পুরো পৃথিবীর সব ধন-সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি দামি হয়ে দাঁড়ায়।
আজ (১১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক ছেলে ও মেয়ে দিবস
সংসারের প্রতিদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর জীবনসংগ্রামের দৌড়ে আমরা অনেক সময় কাছের মানুষগুলোকে মন খুলে একটু ভালোবাসার কথাটাই জানাতে ভুলে যাই। অথচ এই পৃথিবীর বুকে যারা আমাদের অস্তিত্বকে পূর্ণতা দেয়, যাদের একটুখানি মুখের মিষ্টি কথার জন্য বাবা-মা যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকেন, তাদের জন্য উৎসর্গ করা একটি বিশেষ ক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। সম্পর্কের সেই গভীর ও চিরন্তন বাঁধনটাকে ভালোবাসার রঙিন সুতোয় নতুন করে বাঁধতে আজ বিশ্বজুড়ে পরম মমতায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ছেলে ও মেয়ে দিবস। আজকের দিনটি সেইসব রাজপুত্র ও রাজকন্যার জন্য, যারা প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদের সাধারণ ঘরগুলোকে এক একটি স্বর্গীয় সুখের নীড়ে রূপান্তর করে।
আবিষ্কারের পেছনের অনন্য এক স্মৃতিকথা
সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের এই অকৃত্রিম নিঃস্বার্থ মমতাকে সম্মান জানানোর এই চমৎকার ভাবনাটি কিন্তু একদিনে হঠাৎ করে আসেনি। বিশ শতকের সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি রাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের বাসিন্দা জে হেনরি শুয়েজ নামের এক সাধারণ মানুষ প্রথম এই বিশেষ দিনটির কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন। ১৯৭০ সালে তিনি অনুধাবন করেন, আধুনিক জীবনের গতিময়তায় মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যে একটা নীরব দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি নিজের সন্তানকে সাথে নিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে অন্তত একটি সুন্দর দিন কাটানোর বার্তা ছড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সাল থেকে এই অনন্য সামাজিক উদ্যোগটি পুরো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং আগস্টের এই তারিখটিকে ঐতিহাসিকভাবে সন্তানের প্রতি ভালোবাসার প্রতীকী দিন হিসেবে উদযাপন করা শুরু হয়।
সন্তানকে ভালোবাসার মূল রহস্য
আমাদের চারপাশের সমাজে একটানা পড়ালেখার প্রতিযোগিতা, ভালো ফল করার অবাস্তব চাপ আর তথাকথিত সফলতার পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানের মনের জগতটা কেমন যেন এক নিঃসঙ্গ চরে পরিণত হয়। অথচ গবেষণায় পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে, দামি উপহার কিংবা নতুন পোশাকের চেয়ে একটি সন্তান সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে তার মা-বাবার একটুখানি মানসিক সান্নিধ্য ও খোলামেলা খোশগল্প। যখন কোনো বাবা বা মা নিজের শত ব্যস্ততা ভুলে কেবল সন্তানের ভালো লাগা, মন্দ লাগা আর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মন খুলে কথা বলেন, তখনই সেই সন্তানের মন ও ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে বিকাশ লাভ করে। পারিবারিক এই উষ্ণ মেলবন্ধনই সন্তানকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভুল পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং সমাজকে এক নতুন আলোর দিশা দেখায়।
আজকের দিনে ঘরের কোণে জমুক আনন্দের গল্প
জীবনের এই চিরন্তন সত্যকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় যে, আজকের এই ছোট্ট সন্তানগুলোই আগামী দিনে আমাদের হাত ধরে পথ দেখাবে। তাই আজকের পরম আনন্দের বিশেষ ক্ষণে মুঠোফোনের পর্দা আর কাজের যাবতীয় তাগিদকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রাখুন। নিজের পরম স্নেহের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে পরিষ্কার করে বলুন যে, সে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। কাজের টেবিল থেকে কিছুটা সময় ছুটি নিয়ে আজ তাদের নিয়ে মেতে উঠুন প্রিয় কোনো খেলাধুলোয়, বানাইয়া দিন তাদের পছন্দের কোনো বিশেষ সুস্বাদু খাবার কিংবা শুনুন তাদের হাজারো মিষ্টি কৌতূহলের গল্প। হাজারো দুঃখ-কষ্টের মাঝেও পরিবারের এমন সুন্দর মুহূর্তগুলোই পৃথিবীর বুকে স্বর্গের এক টুকরো সুখ এনে দেয়, যার কোনো বিকল্প নেই।