Monday 17 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হাসপাতালের ছাদে কাস্তে হাতে সাক্ষাৎ এক মৃত্যুদূত!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৭ আগস্ট ২০২৬ ১৮:০৭

হাসপাতালের যে কক্ষে অসুস্থ মানুষজন একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখছেন, ঠিক তখনই জানালার বাইরে চোখ পড়তেই বুক হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম। চারপাশের কোলাহল এক লহমায় যেন থমকে গেল। উত্তর ওয়েলসের সেন্ট আসাফ শহরের নামকরা বিসি গ্লান ক্লাইড হাসপাতালের চত্বরে তখন চরম শোরগোল। ২০২৬ সালের ৬ই জুন বিকেলে হাসপাতালের উঁচু ছাদে হঠাৎ দেখা মিলল এক ছায়ামূর্তির। পরনে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা কুচকুচে কালো আলখাল্লা, মাথায় ছায়া ফেলা বড় হুড আর ডান হাতে চকচক করছে এক বিশাল ধারালো কাস্তে। প্রথম দর্শনে রোগী, দর্শনার্থী থেকে শুরু করে কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সদের চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। কারণ পশ্চিমের প্রাচীন রূপকথার সেই বিভীষিকাময় সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত বা ‘গ্রিম রিপার’ যেভাবে প্রাণ হরণ করতে আসে, ছাদের লোকটিকে হুবহু তেমনই দেখাচ্ছিল। ছাদে দাঁড়িয়ে নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অসুস্থ মানুষদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব শব্দ করছিল সেই ব্যক্তি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো হাসপাতাল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ল চরম আতঙ্ক ও তীব্র চাঞ্চল্য।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ ও দমকল বাহিনীর ৫০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর নাটক

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সংকেত বাজিয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীকে খবর দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় সাইরেন বাজানো একাধিক পুলিশ গাড়ি ও দমকল বাহিনীর সুবিশাল বহর। জীবনরক্ষাকারী জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষজন এবং জরুরী বিভাগের চিকিৎসকদের স্বাভাবিক কাজকর্মে শুরু হয় চরম গোলযোগ। ছাদের সেই ছায়ামূর্তি কিন্তু কোনো তোয়াক্কাই করছিল না। পুলিশের বারবার নিচে নেমে আসার তোড়জোড় ও নির্দেশের মুখেও সে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে ছাদে দাঁড়িয়ে নিজের অদ্ভুত নাটক চালিয়ে যায়। একপর্যায়ে উদ্ধারকারীদের চরম বুদ্ধিমত্তা ও দীর্ঘ আলোচনার পর রহস্যময় সেই ব্যক্তিকে ছাদ থেকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং হাতকড়া পরিয়ে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আদালতের কাঠগড়ায় বিচিত্র দাবি: আমি মৃত্যুদূত নই, একটা দাঁড়কাক!

গ্রেপ্তারের পর উন্মোচিত হয় এই ঘটনার পেছনের আসল চরিত্র। ২৬ বছর বয়সী সেই যুবকের নাম লিওন গিলিসপি। ওয়েলসের ডিগানউই এলাকার অধিবাসী এই যুবক কোনো বাস্তব জরুরি প্রয়োজনে কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে আসেননি, বরং শুধুমাত্র আতঙ্ক ছড়াতে ও হইচই তৈরি করতে এই রূপ ধারণ করেছিলেন। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জরুরি কাজে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটানো এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা তৈরির অপরাধে তাকে সরাসরি ল্যান্ডুডনো মেজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। তবে আসল বিনোদন জমা ছিল আদালতের বিচারে। শুনানির সময় গিলিসপির আইনজীবী বিচারকের সামনে এক অদ্ভুত ব্যাখ্যা তুলে ধরে দাবি করেন যে, তার মক্কেল নাকি কোনো সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত বা অপশক্তি সাজেননি। তিনি নাকি কেবল একটি ‘দাঁড়কাক’ সেজেছিলেন! তবে মাথায় হুড, হাতে ধারালো লম্বা কাস্তে নিয়ে হাসপাতালের ছাদে ঘুরে বেড়ানো এই মূর্তিকে আদালতের উপস্থিত কেউ বা স্থানীয় লোকজনের কেউই একটি সাধারণ পাখির সাথে মেলাতে পারেননি।

বিড়ালের খাবার চুরি থেকে চড়া জরিমানার মাশুল

তদন্তে নেমে পুলিশের থলে থেকে বেরিয়ে আসে এই যুবকের পুরোনো অপরাধের হরেক রকম নমুনা। জানা যায়, হাসপাতালের ছাদে এই কাণ্ড ঘটানোর আগেও তার ঝুলিতে ছিল একাধিক চুরির অভিযোগ। চলতি বছরের মার্চ মাসে ল্যান্ডুডনো শহরের এক পোষা প্রাণীর দোকান থেকে বিড়ালের খাবার ও ময়লা পরিষ্কারের সরঞ্জাম চুরি করেছিলেন গিলিসপি। এরপর মে মাসে একটি স্থানীয় বড় সুপারমার্কেট থেকেও খাবার ও পানীয় সামগ্রী সরিয়ে চম্পট দেন তিনি। আদালত এমন সংবেদনশীল স্থানে সাধারণ মানুষ ও রোগীদের ভীতির মুখে ফেলা এবং জনসেবামূলক কাজে বাধা দেওয়ার বিষয়টিকে মোটেও হালকাভাবে নেয়নি। বিচারক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হাসপাতালের মতো জায়গায় এমন অসংবেদনশীল আচরণ কখনোই বিনোদনের উপাদান হতে পারে না। আদালত তাকে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাঙ্গণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে ২০০ পাউন্ড জরিমানা করে। পাশাপাশি আগের চুরির অপরাধ ও আইনি খরচের মাশুলসহ তাকে সব মিলিয়ে মোট সাড়ে চারশো পাউন্ডের বেশি অর্থদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়।

রূপকথার অপচ্ছায়া বনাম বাস্তবের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

পাশ্চাত্যের লোকগাথায় কাস্তে হাতে কালো পোশাকে মোড়া মৃত্যুদূতের যে প্রতীকী চরিত্র রয়েছে, তা মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য এক পরিচিত রূপক। কিন্তু সুস্থ হওয়ার আশায় ব্যাকুল রোগীদের সামনে হাসপাতালের ছাদে সেই রূপ ধারণ করে দাঁড়ানো কতটা ভয়ংকর ও স্পর্শকাতর, তা হয়তো বুঝতে চাননি ওই যুবক। জরুরি উদ্ধারকারী দলের অমূল্য সময় ও সরকারি সম্পদ অপচয় করার এই ঘটনা সামাজিকভাবে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। অবশেষে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পদক্ষেপে ঘটনার সমাপ্তি ঘটলেও, উত্তর ওয়েলসের ওই হাসপাতালের ছাদের আতঙ্কের ৫০ মিনিটের স্মৃতি নিশ্চয়ই অনেক দিন ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর