Wednesday 19 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

স্মৃতিকে আলোর ফ্রেমে বন্দি করে রাখা জাদুকরদের সম্মান জানানোর দিন আজ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৯ আগস্ট ২০২৬ ১৬:৫২

হাতে থাকা ছোট্ট একটা যন্ত্রের ভেতর এক চিলতে আলোর ছোঁয়া, আর অমনি চোখের পলকে থমকে যায় পুরো সময়। বছরের পর বছর কিংবা শত শত যুগ কেটে গেলেও যেই ফ্রেমের ছবি বিন্দুমাত্র পুরোনো হয় না, তা কেবল সেই চারকোনা ছোট্ট ফ্রেমে আটকে থাকা নিঃশব্দ কতগুলো মায়াবী মুহূর্ত। কোনো পরম প্রিয় মানুষের অমলিন হাসি, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের রক্তভেজা কান্না, কিংবা পড়ন্ত বিকেলের সোনালী ডানা মেলা পাখির উড়ে যাওয়া, একটি সঠিক আলোকচিত্র কথা বলে ওঠে হাজারটা কবিতার চেয়েও বেশি বাচনে। কোনো ভাষা ছাড়া, কোনো শব্দ খরচ না করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলার এই জাদুকরী ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করেছে ইতিহাস নিজেও। জীবনের হারিয়ে যাওয়া অতীতকে সজীব রাখার আর কোনো এক ঐতিহাসিক ক্ষণকে নিখুঁত ফ্রেমে ধরে রাখা সেই সব আলোর জাদুকরদের সম্মান জানাতেই বিশ্বজুড়ে ঘুরে এসেছে আজকের এই অনন্য সময়টি, কারণ আজ ১৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস World Photography Day’।

বিজ্ঞাপন

দুশো বছর আগে যুগান্তকারী আবিষ্কারের ইতিহাস

সময়কে ফ্রেমে বন্দি করার এই বিস্ময়কর যাত্রার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে ফরাসী উদ্ভাবকদের হাত ধরে। ১৮৩৭ সালে ফরাসি উদ্ভাবক লুই দাগের এবং নিসেফোর নিয়েপস যৌথ গবেষণায় এক অভিনব উপায় বের করেন, যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তামার পাতের ওপর আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে নিখুঁত প্রতিচ্ছবি খোদাই করা সম্ভব হতো। তাদের এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দাগেরোটাইপ’ প্রযুক্তি। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালের ১৯ আগস্ট ফরাসি সরকার বিজ্ঞান ও শিল্পের এই নতুন রূপকে সারা বিশ্বের মানুষের বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় এবং একে মানবজাতির জন্য এক অসাধারণ উপহার হিসেবে ঘোষণা করে। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকেই স্মরণে রেখে এবং আলোকচিত্রের বিকাশে উদ্ভাবকদের অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর আগস্টের ১৯ তারিখকে বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালনের স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আলোকচিত্রের কারিগররা যুগে যুগে বদলে দিয়েছে মানব ইতিহাস

কেবল ঘরোয়া স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং মানব সভ্যতার বড় বড় পরিবর্তন এবং মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পেছনেও আলোকচিত্রের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশি ক্যামেরা সাংবাদিকদের তোলা সেই সব নির্মম আর করুণ দৃশ্য পৃথিবীর মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, যা আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। আবার কখনো সমুদ্রের উপকূলে পড়ে থাকা এক নিঃস্ব শিশুর করুণ ছবি কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের ধূলিমলিন ফ্রেমে বন্দি হওয়া শিশুর চোখ বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। ক্যামেরার পেছনের একজন মানুষের একটিমাত্র সঠিক সময়ের ছবি সামাজিক অন্যায়, পরিবেশের বিনাশ আর রাজনৈতিক দুর্নীতির মুখাশ খুলে দিতে পারে মুহূর্তের মধ্যে, যা আধুনিক ইতিহাস রচনায় এক অবিচ্ছেদ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে।

অ্যানালগ পজিটিভ ফিলিম থেকে আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরার মেগাপিক্সেল যুগ

এক সময় ক্যামেরায় ডার্করুমে রাসায়নিক তরলে ভিজিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ছবি পজিটিভ থেকে প্রিন্ট করার যে ধৈর্য আর রোমাঞ্চ ছিল, আধুনিক ডিজিটাল যুগে সেটি বদলে গেছে কয়েক মেগাপিক্সেল আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আঙুলের ছোঁয়ায়। আজকাল প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা যন্ত্রটিতেই আটকে আছে উচ্চমানের ক্যামেরা, কিন্তু তবুও আলোকচিত্রের মূল নির্যাস কিন্তু সামান্যতম কমেনি। ক্যামেরা যত উন্নতই হোক না কেন, ছবির মূল প্রাণ লুকিয়ে থাকে সেই আলো আর ছায়ার বিন্যাসে, আলোকচিত্রী দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তটিকে অনুভব করার সহজাত ক্ষমতায়। প্রযুক্তি যত বদলাক না কেন, সময়কে ধরে রাখার মূল আবেগ আর ক্যানভাসের গল্পটা আজও রয়ে গেছে সেই আগের মতোই জীবন্ত ও অমলিন।

ক্যামেরার চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখার উদাত্ত আহ্বান

চারপাশের ঘটে যাওয়া অজস্র কোলাহলের ভিড়ে প্রতিদিন কত শত সুন্দর মুহূর্ত আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হারিয়ে যায়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ তাই আপনার হাতের ক্যামেরা বা মুঠোফোনটি হাতে তুলে নেওয়ার দারুণ এক শুভ লগ্ন এসেছে। রঙিন ডিজিটাল দুনিয়ার চোখ ধাঁধানো কৃত্রিমতার বাইরে গিয়ে আপনার চেনা শহর, স্বজনদের ভালোবাসার অমলিন হাসি কিংবা প্রকৃতির কোনো নিভৃত কোণকে ফ্রেমে বন্দি করে ফেলুন দ্বিধাহীনভাবে। মনে রাখবেন, একটি ভালো ছবি কেবল একটি কাগজের টুকরো বা মেমোরি কার্ডের ডিজিটাল পিক্সেল নয়, এটি হলো ভালোবাসার স্মৃতিকে আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকালের মতো জীবন্ত করে রাখার এক অপূর্ব কালজয়ী শিল্প।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর