সূর্যের আলো যেমন ধনী-দরিদ্র, পাহাড়-সমুদ্র বা নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ চেনে না, তেমনই এই পৃথিবীর আকাশ-বাতাস আর সুযোগের ওপর সবার অধিকার সমান। অথচ সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই অর্ধেক আকাশ ধারণ করা নারীদের সেই মৌলিক অধিকারটুকু ছিনিয়ে নিতে কত শত কঠিন শৃঙ্খল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল! ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রাখা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া কিংবা সমাজের মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার এক নির্মম চক্রান্ত দেখেছে ইতিহাস। কিন্তু শেকল যতই শক্ত হোক না কেন, বাঁধ ভাঙার গান তো থামানো যায় না। নিপীড়ন আর বৈষম্যের কড়া বেষ্টনী ভেদ করে নারীরা বারবার গর্জে উঠেছেন, লড়াই করেছেন নিজেদের আত্মমর্যাদা আর মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য। এটি কেবল কোনো করুণার দাবি ছিল না, ছিল অর্জনের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। অন্যায়ের সেই কালো দেয়াল ভেঙে সাম্যের নতুন ভোর ছিনিয়ে আনার অদম্য জেদ আর সাহসী নারীদের ঐতিহাসিক বিজয়কে উদযাপিত করতেই ক্যালেন্ডারের পাতায় এসেছে এই বিশেষ দিনটি। প্রতি বছর ২৬শে আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারী সমতা দিবস (Women’s Equality Day) পালिত হয়।
অধিকার আদায়ের ইতিহাস
নারী অধিকারের এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ লড়াইয়ের ইতিহাসে এক স্মরণীয় মোড় এসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজপথের সংগ্রাম, অনশন আর অগণিত নারীর আত্মত্যাগের পর ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট মার্কিন সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা প্রথমবারের মতো তাদের পবিত্র ভোটাধিকার লাভ করেন, যা ছিল সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম বড় রাজনৈতিক বিজয়। এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭১ সালে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য বেলা আবজুগ ২৬ আগস্টকে একটি বিশেষ দিন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটিকে স্বীকৃতি দেন। সেই থেকে প্রতি বছর গভীর শ্রদ্ধা ও উদ্দীপনার সাথে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। আজ ২৬ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে নারী সমতা দিবস বা উইমেনস ইকুয়ালিটি ডে। শত বছরের লড়াই আর ভোটাধিকারের সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে ধারণ করে আজ বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে এই পরম সাম্যের দিন।
সমতার দীপ্ত আলো
আজকের দিনে নারী সমতা মানে কিন্তু কেবল ভোটাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সমাজের সর্বস্তরে নারীর সমান সুযোগ ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করার মাঝে। একই কাজের জন্য সমান মজুরি পাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর স্বাধীন কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের সহিংসতা ও মানসিক বাধা থেকে নারীকে মুক্ত রাখাই হলো এই দিবসের আসল চেতনা। আজ বিশ্বজুড়ে নারীরা রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলা, মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে করপোরেট বিশ্ব, সব জায়গায় নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। কিন্তু বিশ্বের অনেক প্রান্তেই এখনো নারীরা নানা অদৃশ্য বাধা ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই দিনটি বিশ্ববাসীকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজ বা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে নারীদের পিছনে ফেলে রাখা যাবে না, বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান পদক্ষেপে এগিয়ে চলাই হলো সত্যিকারের প্রগতির মূল চাবিকাঠি।
সাম্যের নতুন দিগন্ত
একটি সার্থক ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে নারী-পুরুষের দ্বৈরথ নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সমান সুযোগের মুক্ত পরিবেশ। দিনশেষে লড়াইটা কারোর থেকে ভালো বা বড় হওয়ার নয়, লড়াইটা হলো একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়ার পূর্ণ অধিকার পাওয়ার। অন্ধকার যুগের সব সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য আর ইগোর দেয়াল ভেঙে আজ আমাদের এমন এক পৃথিবী গড়তে হবে, যেখানে কোনো কন্যাসন্তানকে তার লিঙ্গের কারণে নিজের স্বপ্ন ছোট করতে না হয়। এই দিনটি আমাদের প্রতিটি গৃহ, কর্মক্ষেত্র ও সমাজভাবনায় সমতার বীজ বপন করার নতুন অঙ্গীকার নেওয়ার আহ্বান জানায়। আসুন, আজ ২৬ আগস্টের এই অর্থবহ দিনে আমরা সবাই এক হয়ে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত এক আলোকিত ভুবন গড়ার শপথ নিই। কুসংস্কারের সব শিকল গুঁড়িয়ে দিয়ে এক সাথে বলি, সুযোগ আর সম্মানের এই আকাশে সবার স্থান সমান।