ঘন জঙ্গল, গাছে গাছে ঝুলতে থাকা লতা আর বুক কাঁপানো গর্জন ‘টারজান’ নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম আফ্রিকার এক রহস্যময় রূপকথা। ছোট-বড় সবাইকে রোমাঞ্চের সাগরে ভাসানো এই অমর চরিত্রের জন্ম যিনি দিয়েছিলেন, সেই শিকাগোর তরুণ এডগার রাইস বারোজের শুরুর জীবনটা অবশ্য মোটেই রোমাঞ্চকর বা রঙিন ছিল না। ১৮৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া বারোজের শৈশব কাটে অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন দেখে। অথচ বাস্তব জীবনে একের পর এক ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে ছত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছেও তিনি ছিলেন দিশেহারা। সোনার খনিতে কাজ করা, পেন্সিল শার্পনার বিক্রি করা কিংবা রেলওয়ের পাহারাদার হিসেবে ঘোরাঘুরি কোনো কাজই তাকে সাফল্য দিতে পারেনি। কিন্তু ভেতরে পুষে রাখা কল্পনার ডানা দুটি তিনি কখনো ভেঙে যেতে দেননি।
দিনযাপনের তাগিদে একসময় তিনি পাল্প ম্যাগাজিনে সস্তা সব গল্প পড়তে শুরু করেন। নিজের লেখার দক্ষতা মেপে দেখতেই হঠাৎ কাগজ আর কলম নিয়ে বসে পড়েন বারোজ। প্রথম দিকে মঙ্গলের কল্পবিজ্ঞান নিয়ে লেখালিখি শুরু করলেও ১৯১২ সালে তার হাত ধরে জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক কাল্পনিক চরিত্র জঙ্গলে সিংহ ও বানরদের মাঝে বেড়ে ওঠা এক অভিজাত শ্বেতাঙ্গ শিশু ‘টারজান’। প্রকাশের সাথে সাথেই রাতারাতি বদলে যায় গল্প। পাঠকেরা যেন বুঁদ হয়ে যান বারোজের শব্দজালে। তার সহজ কিন্তু টানটান বর্ণনা মানুষকে বাস্তব জগতের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে নিয়ে যেত অন্য এক রূপকথার দুনিয়ায়।
টারজানের তুমুল জনপ্রিয়তা বারোজকে কেবল একজন সফল লেখকই বানায়নি, তাকে পরিণত করেছিল তৎকালীন পপ কালচারের এক অনন্য পথিকৃতে। তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন তার এই সৃষ্টির শক্তি। শুধু বইয়ের পাতাতেই টারজানকে আটকে না রেখে তিনি এর কমিকস, সিনেমা এবং নানা রকমের খেলনার স্বত্ব বা মার্চেন্ডাইজ বিক্রি শুরু করেন, যা সে যুগে এক নজিরবিহীন বিপণন কৌশল ছিল। বলা যায়, আধুনিক বিনোদন জগতের অনেক বাণিজ্যিক ধারার গোড়াপত্তন তার হাত ধরেই হয়েছিল। জীবনের শেষ ভাগে ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি যেখানে বিশাল জমি কিনেছিলেন, সেই শহরের নামই পরে রাখা হয় ‘টারজানা’।
তবে এডগার রাইস বারোজ কেবল টারজান সৃষ্টি করেই থেমে যাননি। তার উর্বর কল্পনাশক্তি জন্ম দিয়েছিল আরও বহু চোখধাঁধানো রূপকথা ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর। টারজানেরও আগে তিনি শুরু করেছিলেন তার বিখ্যাত ‘বারসুম’ বা ‘মার্স’ সিরিজ, যেখানে মঙ্গলের রহস্যময় জগতে ‘জন কার্টার’ নামের এক বীরের অ্যাডভেঞ্চার ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল যার প্রথম বই ছিল ‘এ প্রিন্সেস অব মার্স’। এ ছাড়াও পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে লুকানো আদিম এক দুনিয়া নিয়ে তার ‘পেলুসিডার’ সিরিজ, শুক্র গ্রহের অভিযানভিত্তিক ‘ভেনাস’ সিরিজ এবং ‘দ্য ল্যান্ড দ্যাট টাইম ফরগট’-এর মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম বিশ্বজুড়ে বিপুল সমাদৃত হয়। কল্পবিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার কাউবয় জীবন নিয়ে ‘দ্য ওয়ার চিফ’ কিংবা মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপটে ‘দ্য আউটল অব টর্ন’-এর মতো চমৎকার সব ওয়েস্টার্ন ও ঐতিহাসিক উপন্যাসও লিখেছেন। সব মিলিয়ে জীবদ্দশায় তিনি ৮০টিরও বেশি বই ও ছোটগল্প উপহার দিয়ে গেছেন।
কল্পনার রাজ্যে অগণিত পাঠককে বুঁদ করে রাখা এই কালজয়ী লেখক ১৯৫০ সালের ১৯ মার্চ ৭৪ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিফলতার মেঘ সরিয়ে কল্পনার শক্তিতে বিশ্বজয়ের এমন রূপকথার গল্প সত্যিই বিরল, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বপ্ন দেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না এবং সৃষ্টিশীলতা মানুষকে অমর করে রাখে।