সুস্বাদু ফল খাওয়ার আনন্দে মেতে উঠে আমরা কত কিই না করি । ঋতুভিত্তিক ফল উৎসব তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই ফলের শক্ত বীজ যদি মাসের পর মাস পেটের ভেতর জমা হতে থাকে তবে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা কল্পনার বাইরে। তুরস্কের জংগুলদাক শহরের ৯২ বছর বয়সী বৃদ্ধা শেরিফে আয় ছোটবেলা থেকেই ফল খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন। বিশেষ করে সুস্বাদু জলপাই আর মিষ্টি খেজুর ছিল তার নিত্যদিনের প্রিয় খাদ্য। তবে ফল খাওয়ার সময় বিচি ফেলে দেওয়ার অলসতা তিনি কোনোদিনই ছাড়তে পারেননি। পরম আনন্দে তিনি বিচি সহই ফল গিলে ফেলতেন। পরিবারের লোকজন তাকে বহুবার বারণ করলেও তিনি কারো কথায় কান দেননি। বছরের পর বছর ধরে অবচেতনভাবে গিলে ফেলা সেইসব শক্ত বিচি তার পরিপাকতন্ত্রের ভেতর জমে তৈরি করেছিল এক মারাত্মক পাথরের মতো বাধা। হঠাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে একদিন প্রচণ্ড পেটের ব্যথা, বমি ও তীব্র শারীরিক অস্বস্তি নিয়ে যখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যা ধরা পড়ে তা দেখে চিকিৎসকদেরও চোখ চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হয়।
অন্ত্রে চার সেন্টিমিটারের বিচি
জরুরি এক্স-রে ও আধুনিক সিটি স্ক্যানে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পেটের ভেতর জমে থাকা সেই বিচিগুলো তার ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে চরম ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। একটি চার সেন্টিমিটারের দানবীয় বিচি সরাসরি তার অন্ত্র ফুটো করে দিয়ে ভেতরে পচন ধরিয়ে দিয়েছিল। এই বিষাক্ত সংক্রমণ তাকে সরাসরি মৃত্যুর দোরগোড়ায় নিয়ে দাঁড় করায়। চিকিৎসকরা বিন্দুমাত্র কাল বিলম্ব না করে জরুরিভিত্তিতে টানা দুই ঘণ্টার এক অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। বৃদ্ধার বয়স ৯২ বছর হওয়ায় এই অস্ত্রোপচার চিকিৎসকদের জন্য ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতির গুণে অস্ত্রোপচার কক্ষেই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা, যা হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দেয়।
পাকস্থলী থেকে উদ্ধার হলো বিচির পাহাড়ি স্তূপ
তুরস্কের জংগুলদাক শহরের বুলেন্ত এজেভিত বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের অভিজ্ঞ অস্ত্রোপচারকারী দলের চিকিৎসকরা শেরিফে আয়ের অন্ত্র ও পাকস্থলী থেকে একে একে বের করে আনেন অবিশ্বাস্য সব বস্তু। টানা প্রচেষ্টার পর তার পেট থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৫টি জলপাইয়ের বিচি, ২৮টি খেজুরের বিচি এবং সাড়ে পাঁচ সেন্টিমিটারের ৫টি বিশাল আকৃতির জমাট বাঁধা বিচির পিণ্ড। অন্ত্রের পচে যাওয়া টিস্যু কেটে বাদ দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। অস্ত্রোপচার শেষে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে কয়েক দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটানোর পর অবশেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন এই প্রবীণ নারী।
জীবন ফিরে পেয়ে বৃদ্ধার চিরদিনের শিক্ষা
চিকিৎসকদের এই অসামান্য সাফল্য ও বৃদ্ধার অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা আলোচনার ঝড় তোলে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানিয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে শেরিফে আয় মিষ্টি হাসিতে প্রতিজ্ঞা করেন, খাবারের স্বাদের লোভে জীবনে আর কোনোদিন ভুলেও কোনো ফলের বিচি গিলে ফেলবেন না। এই ঘটনা আমাদের সবার জন্যই এক বিরাট বার্তা দেয় যে, অবহেলা করে ফলের বিচি পেটে চালান করে দেওয়ার সামান্য অভ্যাসও কীভাবে জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।