Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কুয়াকাটা ভ্রমণ: রূপালী সৈকতে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সাথে কয়েক দিন

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২২ জুলাই ২০২৬ ২০:০০

দক্ষিণের হাওয়া আর সাগরের বিশালতা যাদের টানে, তাদের জন্য কুয়াকাটা সব সময়ই এক অনন্য স্বর্গ। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার এই বিরল সুযোগ পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই আছে। ইট-পাথরের ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে সাগরের ঢেউয়ের শব্দে হারিয়ে যেতে কুয়াকাটার তুলনা হয় না। যারা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে একদম তরতাজা হয়ে ফিরতে চান, তাদের জন্য এই রূপালী সৈকত এক আদর্শ লাইফস্টাইল ডেস্টিনেশন।

সবুজে ঘেরা চমৎকার ইকো পার্ক

সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে মাত্র দেড় কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়বে চমৎকার একটি পরিকল্পিত ইকো পার্ক। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি এক দারুণ ভ্রমণের জায়গা। এই পার্কটিতে পা রাখলেই চারপাশ সবুজ গাছপালায় ঘেরা শান্ত এক পরিবেশ মন ভালো করে দেয়। এখানে আছে ঝাউ, বকুল, অর্জুন, জারুল, হিজল, মহুয়া, কামিনী ও শেফালির মতো হরেক রকমের ফুল ও কাঠের গাছ। শুধু তাই নয়, আমলকী, পেয়ারা, জাম, হরীতকী ও করমচার মতো নানা ফলের গাছেও সমৃদ্ধ এই উদ্যান। বনের বুক চিরে চলে গেছে মাটির সুন্দর মেঠোপথ। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে পিকনিক শেড, শৌচাগার এবং সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এই ইকো পার্কের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ভেতরের লেকটিতে। লেকের দুই পাশ দিয়ে হাঁটার সুন্দর রাস্তা আর মাঝখানে চমৎকার বেইলি সেতু থাকার কারণে জায়গাটি ঘুরে বেড়ানো এবং ছবি তোলার জন্য দারুণ উপযোগী।

বিজ্ঞাপন

ফাতরার চর এবং গঙ্গামতির অ্যাডভেঞ্চার

কুয়াকাটার মূল সৈকত থেকে কিছুটা পশ্চিমে সাগরের মোহনায় অবস্থিত এক অনন্য সুন্দর বনাঞ্চল হলো ফাতরার চর, যা সরকারি নথিপত্রে টেংরাগিরি নামে পরিচিত। সুন্দরবনের আবহ ছড়ানো এই ম্যানগ্রোভ বনটি শীতের দিনে অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, কুয়াকাটার মূল সৈকত থেকে পুব দিকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে আছে নির্জন ও মনোমুগ্ধকর গঙ্গামতির চর। এখানে যাওয়ার পথটা বেশ রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা কষ্টকর হলেও পৌঁছানোর পর সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এই চরে মিলবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেখানে একদিকে আছে নীল জলরাশি আর অন্যদিকে সাদা বালুর বিস্তৃত বেলাভূমি। এই বেলাভূমির তীরে কেওড়া, গেওয়া, ছইলা ও বাইন গাছের সবুজ অরণ্য ছায়া বিছিয়ে রাখে, যা শহুরে জীবনের সব একঘেয়েমি দূর করে দেয়।

ঐতিহ্যবাহী নারকেল বাগান ও জ্যোৎস্নার মায়া

কুয়াকাটার একদম কাছেই ষাটের দশকে প্রায় দুইশত একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল একটি বিশাল নারকেল বাগান, যা স্থানীয়ভাবে ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস লিমিটেড নামে বেশ পরিচিত। এই সুউচ্চ নারকেল গাছের সারির মাঝে মাঝে প্রচুর পেয়ারা ও কাজুবাদামের গাছও চোখে পড়ে। বিশেষ করে শীতের মৌসুমে চড়ুইভাতি বা পিকনিক করার জন্য পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় এই বাগানটি থাকে ওপরের দিকে। তবে এই বাগানের আসল রূপ খোলে রাতের বেলা। আকাশে যখন রূপালী চাঁদ ওঠে, তখন নারকেল পাতার ফাঁক গলে চুইয়ে পড়া জ্যোৎস্নার আলোয় সাগরের গর্জন শুনতে শুনতে বসে থাকার অভিজ্ঞতা অন্যরকম এক মায়াবী জগতে নিয়ে যায়।

শুঁটকিপল্লীর ব্যস্ত জীবন ও কেনাকাটা

কুয়াকাটার মূল জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই দেখা মিলবে এক ভিন্নধর্মী লাইফস্টাইলের। এটি কুয়াকাটার বিখ্যাত শুঁটকিপল্লী, যেখানে জেলেরা বঙ্গোপসাগর থেকে গভীর রাতে ধরে আনা তাজা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। এখানে লইট্টা, ছুরি, ফালিসা, কোরাল, রূপচাঁদা, পোয়া ও নামী ভোল মাছের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যস্ত দৃশ্য দেখতে পর্যটকরা ভিড় জমান। এই পল্লীতে প্রবেশ করলে শুঁটকির তীব্র গন্ধ নাকে আসবে, যা একটু মানিয়ে নিতে হবে। ভ্রমণের স্মারক হিসেবে কিংবা ঘরে রান্নার জন্য এখান থেকে একদম সাশ্রয়ী মূল্যে ভেজালমুক্ত ও হরেক পদের মজাদার শুঁটকি মাছ কিনে নিতে পারেন। সাগরের মৃদু বাতাস গায়ে মেখে সৈকতের এই রূপ উপভোগ করা যেকোনো পর্যটকের জন্যই এক আজীবন মনে রাখার মতো স্মৃতি।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন

কুয়াকাটা যাওয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলো নৌপথ। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকেলে ও সন্ধ্যায় পটুয়াখালী বা আমতলীর উদ্দেশ্যে বিলাসবহুল লঞ্চ ছেড়ে যায়। লঞ্চের সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া সাধারণত ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। ডেকের ভাড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। লঞ্চ থেকে সকালে পটুয়াখালী বা আমতলী নেমে সেখান থেকে বাসে করে কুয়াকাটা পৌঁছানো যায়, যাতে খরচ হবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি বাসেও যাওয়া যায়। গাবতলী বা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কুয়াকাটার সরাসরি এসি ও নন-এসি বাস রয়েছে। নন-এসি বাসের ভাড়া ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এখন মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টায় সরাসরি বাসে কুয়াকাটা পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

কোথায় থাকবেন এবং খরচ

পর্যটকদের থাকার জন্য কুয়াকাটায় এখন চমৎকার সব আধুনিক হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। আপনার বাজেট এবং পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন যেকোনো একটি। অভিজাত ও আরামদায়ক অভিজ্ঞতার জন্য ‘সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাস’ কিংবা ‘গ্র্যান্ড ওশান ভিউ রিসোর্ট’ বেশ জনপ্রিয়। এসব রিসোর্টেルーム প্রতি খরচ প্রতি রাতের জন্য ৪,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। মাঝারি বাজেটের মধ্যে থাকতে চাইলে ‘হোটেল গ্র্যান্ড কুয়াকাটা’, ‘কুয়াকাটা গেস্ট হাউজ’ কিংবা ‘পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল ইয়ুথ ইন’-এ বুকিং করতে পারেন, যেখানে প্রতি রাতের ভাড়া ২,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে। একদম সাধারণ ও সাশ্রয়ী বাজেটের হোটেলের ভাড়াও পেয়ে যাবেন ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে। তবে পর্যটন মৌসুমে বা ছুটির দিনে যাওয়ার আগে অগ্রিম বুকিং করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়া

ভ্রমণের আনন্দ পূর্ণতা পায় স্থানীয় খাবারের স্বাদ না নিলে। কুয়াকাটায় শুঁটকি মাছের নানা পদ এবং তাজা ইলিশের ঝোল অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্থানীয় শুঁটকি বাজারে হরেক রকমের শুঁটকি পাওয়া যায়, যা আপনি বাসায় নিয়ে আসার জন্য কিনতে পারেন। রাখাইনদের তৈরি স্থানীয় হস্তশিল্প, গহনা এবং তাঁতের কাপড়ের জন্য রাখাইন মার্কেট বেশ নামকরা। সেখান থেকে প্রিয়জনদের জন্য চমৎকার সব স্মারক বা উপহার সামগ্রী সাশ্রয়ী মূল্যে কিনে নিতে পারেন। সাগরের মৃদু বাতাস গায়ে মেখে, ঝিনুকের তৈরি জিনিসপত্র দেখতে দেখতে সৈকতে হাঁটা আপনাকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো স্মৃতি উপহার দেবে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর