বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশি আর বালুকাময় তটের টানে প্রতি বছর অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে যান ভারতের বিভিন্ন সৈকতে। ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বৈচিত্র্যময় সব সমুদ্রসৈকত। কোথাও সাগরের উত্তাল ঢেউ, আবার কোথাও শান্ত-নিশ্চুপ পরিবেশ মনকে জুড়িয়ে দেয়। যারা ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে একদম নতুন এক লাইফস্টাইল ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের জন্য ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ৫টি সমুদ্রসৈকতের বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো।
রাধানগর সৈকত (আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ)
এশিয়ার অন্যতম সেরা এবং সুন্দর সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত আন্দামানের হ্যাভলক দ্বীপের রাধানগর সৈকত। এই সৈকতের মূল আকর্ষণ হলো এর স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ নীল জল আর ধবধবে সাদা নরম বালুকা বেলাভূমি। সৈকতের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বনাঞ্চল এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্ত ও নির্জন পরিবেশে সময় কাটানো কিংবা নীল জলে সাঁতার কাটার জন্য এটি এক স্বর্গীয় স্থান।
যাতায়াত: ঢাকা থেকে প্রথমে বিমানে কলকাতা বা চেন্নাই যেতে হবে। সেখান থেকে বিমানে আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছানো যায়। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে নিয়মিত চলাচলকারী ফেরি বা ক্রুজে করে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টায় হ্যাভলক দ্বীপে পৌঁছানো সম্ভব, যার ভাড়া ১,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে।
থাকা-খাওয়া: হ্যাভলক দ্বীপে থাকার জন্য চমৎকার সব ইকো-রিসোর্ট ও হোটেল রয়েছে। ‘তাজ ডিলন রিসোর্ট’ কিংবা ‘বেয়ারফুট অ্যাট হ্যাভলক’-এর মতো বিলাসবহুল রিসোর্টে প্রতি রাতের ভাড়া ৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। মাঝারি মানের ভালো হোটেলের ভাড়া ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে। এখানে ফ্রেশ সামুদ্রিক মাছের হরেক রকম পদ বেশ জনপ্রিয়।
পালোলেম সৈকত (গোয়া)
গোয়ার একদম দক্ষিণে অবস্থিত পালোলেম সৈকতটি তার শান্ত পরিবেশ এবং অর্ধচন্দ্রাকৃতির গঠনের জন্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। উত্তর গোয়ার সৈকতগুলোর মতো এখানে অতিরিক্ত শোরগোল নেই, ফলে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এটি একদম আদর্শ। সৈকতের তীরে সারিবদ্ধ নারকেল গাছের সারি এবং রঙিন বিচ হাট বা কাঠের কুঁড়েঘরগুলো এক চমৎকার লাইফস্টাইল ভাইব তৈরি করে।
যাতায়াত: ঢাকা থেকে বিমানে সরাসরি মুম্বাই বা দিল্লি হয়ে গোয়ার মোপা অথবা ডাবোলিম বিমানবন্দরে যাওয়া যায়। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি বা বাস যোগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় পালোলেম সৈকতে পৌঁছানো সম্ভব। ট্যাক্সি ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মতো।
থাকা-খাওয়া: পালোলেম সৈকতের ঠিক বুকেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিচ হাট। শীতের মৌসুমে এগুলোতে থাকার খরচ প্রতি রাতে ২,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। এছাড়া সৈকতের কাছাকাছি ভালো মানের হোটেল ও রিসোর্ট পেয়ে যাবেন ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে। এখানে গোয়ান সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী খাবার ও আন্তর্জাতিক পদের স্বাদ নেওয়া যায়।
ওম সৈকত (গোকর্ণ, কর্ণাটক)
যারা গোয়ার চেয়েও শান্ত এবং কিছুটা আধ্যাত্মিক আবহযুক্ত সৈকত পছন্দ করেন, তাদের জন্য কর্ণাটকের গোকর্ণের ওম সৈকত এক অনন্য আবিষ্কার। উপর থেকে দেখলে এই সৈকতের আকৃতি পুরোপুরি হিন্দু সনাতন ধর্মের পবিত্র ‘ওম’ (ॐ) চিহ্নের মতো দেখায়, আর এ কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে ওম বিচ। পাথুরে পাহাড় এবং নীল সাগরের এই মিতালী প্রকৃতিপ্রেমীদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে।
যাতায়াত: গোয়ার বিমানবন্দর থেকে গোকর্ণের দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। গোয়া থেকে ট্যাক্সি বা ট্রেনে করে খুব সহজেই গোকর্ণ আসা যায়। এছাড়া বেঙ্গালুরু বা ম্যাঙ্গালুরু থেকেও সরাসরি দূরপাল্লার বাসে গোকর্ণ পৌঁছানো সম্ভব, যাতে খরচ হবে ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
থাকা-খাওয়া: ওম সৈকতে থাকার জন্য সাধারণ বিচ ক্যাফে ও কটেজ রয়েছে, যেগুলোর ভাড়া ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে। একটু ভালো মানের থাকার জায়গার জন্য ‘কাহানি প্যারাডাইস’ বা ‘জিলিভ রিসোর্ট’-এ বুকিং করতে পারেন, যেখানে খরচ পড়বে ৫,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত।
কভালাম সৈকত (কেরালা)
ঈশ্বরের নিজস্ব দেশ কেরালায় অবস্থিত কভালাম সৈকতটি তার অনন্য লাল ও সাদা রঙের বাতিঘর বা লাইটহাউসের জন্য বিশ্বখ্যাত। এখানে তিনটি পাশাপাশি অর্ধচন্দ্রাকৃতির সৈকত রয়েছে, যার মধ্যে লাইটহাউস সৈকতটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। আরব সাগরের উত্তাল ঢেউ আর তীরের পাম গাছের সারি এই সৈকতের সৌন্দর্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এখানে আয়ুর্বেদিক ম্যাসেজ ও স্পা নেওয়ার লাইফস্টাইল পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
যাতায়াত: কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরম (ত্রিবান্দ্রম) বিমানবন্দর বা রেলওয়ে স্টেশন থেকে কভালাম সৈকতের দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। বিমানবন্দর থেকে প্রিপেইড ট্যাক্সি বা অটো রিকশায় চড়ে মাত্র ৩০ মিনিটে এখানে পৌঁছানো যায়, যার খরচ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো।
থাকা-খাওয়া: কভালামে সব বাজেটের পর্যটকদের জন্যই থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ও বিলাসবহুল আয়ুর্বেদিক রিসোর্টগুলোর ভাড়া প্রতি রাতে ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। সাধারণ মানের হোটেল বা হোমস্টে পেয়ে যাবেন ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে। সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার এবং কলার পাতায় মোড়ানো মাছ ভাজা এখানকার বিশেষত্ব।
পুরী সমুদ্রসৈকত (ওড়িশা)
বাঙালি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে চিরচেনা এবং আবেগের এক সমুদ্রসৈকত হলো ওড়িশার পুরী। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ও বিশাল ঢেউয়ের গর্জন শুনতে এবং পুণ্যস্নানের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। সৈকতের জিরো পয়েন্টের মতো বিস্তীর্ণ বালুকা বেলাভূমিতে উটের পিঠে চড়া, স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজার ঘুরে দেখা এবং বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরে দর্শন করার এক দারুণ সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ঘটে এই ভ্রমণে।
যাতায়াত: ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেনে সরাসরি পুরী যাওয়া সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম। কলকাতা বা হাওড়া স্টেশন থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেস, শতাব্দী এক্সপ্রেসসহ বেশ কিছু ট্রেন প্রতিদিন পুরী যায়। ট্রেনের স্লিপার ক্লাসের ভাড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং এসি চেয়ার কার বা টিয়ারের ভাড়া ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা।
থাকা-খাওয়া: পুরী সমুদ্রসৈকতের একদম মুখোমুখি শত শত হোটেল গড়ে উঠেছে। সাগরের দিকে মুখ করা ভালো মানের নন-এসি রুমের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা এবং এসি রুমের ভাড়া ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে। পুরীতে ঐতিহ্যবাহী ওড়িয়া থালি এবং জগন্নাথ দেবের মহাপ্রসাদের স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই মিস করা যাবে না।
মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও, নতুন করে শুরু হয়েছে ভারতের ভিসা প্রসেসিং। বাংলাদেশের ঠিক পাশের দেশটায় ঘুরে আসার আকাঙ্ক্ষা অনেকের-ই । কেউ আবার চিকিৎসার জন্যও যান। সেই ফাঁকেও কিছুটা ঘুরে দেখেন মন ভালো করতে। তাই সমুদ্র সৈকত ভালোবাসের এমন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য, বেশ আনন্দদায়ক হবে এই পাঁচ সৈকত।