Wednesday 29 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ময়মনসিংহের বুকে ঐতিহ্যের রূপকথা ‘শশী লজ’ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৯ জুলাই ২০২৬ ১৮:২০

ইটের শহরের ব্যস্ততা আর একঘেয়ে জীবন থেকে বিরতি নিয়ে হুট করেই যদি ইচ্ছে করে একটু অতীতে ডুব দিতে, তবে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শশী লজ আপনার জন্য হতে পারে এক আদর্শ গন্তব্য। রাজধানী ঢাকা থেকে খুব কাছেই হওয়ায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই একদিনের মধ্যে খুব সহজে গিয়ে ঘুরে আসা যায় এই রাজপ্রাসাদে।

পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজপ্রাসাদটি কেবল একটি প্রাচীন স্থাপত্য নয়; এটি রাজকীয় আভিজাত্য, শিল্পপ্রীতি এবং এক শতাব্দী আগের জমিদারি আমলের নানা গল্পের এক চমৎকার মিলনমেলা।

ইতিহাসের পাতা উল্টে: যেভাবে গড়ে উঠল শশী লজ

ঊনবিংশ শতকের শেষদিকের কথা। মুক্তাগাছার বিখ্যাত এবং দূরদর্শী জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী তাঁর দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামানুসারে ময়মনসিংহের এই মূল শহরে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৭ সালের মধ্যে নির্মিত এই প্রাসাদটির পেছনে রয়েছে এক বেদনাময় ইতিহাস। মূল প্রাসাদটি তৈরির পরপরই ১৮৯৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে তা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

তবে থেমে থাকেননি মহারাজা। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী অত্যন্ত নিখুঁত ও নিপুণ নকশায় বর্তমান দ্বিতল শশী লজটি নতুন করে পুনর্নির্মাণ করেন। প্রায় নয় একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদটির প্রতিটি কোণ আজও জমিদারি আমলের সেই সোনালী দিনগুলোর গল্প বলে যায়।

স্থাপত্যশৈলী ও চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য

শশী লজের সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর অপূর্ব ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলী। ধ্রুপদী গ্রিক ও রোমান ধারার নকশা আর দেশীয় রুচির এক মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। প্রাসাদের মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই বিশাল ঘাসের সবুজ মাঠ এবং চমৎকার বাগান আপনাকে স্বাগত জানাবে।

প্রাসাদের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে

গ্রিক দেবী ভেনাসের মার্বেল মূর্তি: প্রাসাদ প্রাঙ্গণের কেন্দ্রস্থলে একটি সুদৃশ্য ফোয়ারা রয়েছে, যার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের একটি অপূর্ব মার্বেল পাথরের মূর্তি। মার্বেলের মসৃণতায় আলো ঠিকরে পড়ার দৃশ্যটি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্য ইউরোপের কোনো প্রাচীন প্রাসাদে নিয়ে যাবে।

বিশাল ঝাড়বাতি ও নাচঘর: প্রাসাদের ভেতরে ঢুকলে কাঠ ও ইটের সমন্বয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন মেঝে, কারুকাজ করা ছাদ এবং তৎকালীন রাজকীয় নাচঘর বা বলরুম দেখা যায়। ক্রিস্টালের বিশাল ঝাড়বাতিগুলো একসময় যেভাবে আলো ছড়াত, তা কল্পনা করলেও মন শিহরিত হয়।

গোপন সুড়ঙ্গ ও গোসলখানা: প্রাসাদের পেছনের অংশে একটি বাথহাউস বা গোসলখানা রয়েছে, যার ভেতরে রয়েছে সুইমিং পুল সদৃশ ব্যবস্থা। লোকমুখে শোনা যায়, প্রাসাদের ভেতরে নিরাপত্তার স্বার্থে বেশ কিছু গোপন পথ বা সুড়ঙ্গও তৈরি করা হয়েছিল।

একদিনে গিয়ে আসার পারফেক্ট প্ল্যান ও যাতায়াত খরচ

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ শহরের দূরত্ব মাত্র ১২০ কিলোমিটারের মতো। তাই সকালে উঠে রওনা দিলে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যেই ময়মনসিংহ পৌঁছে যাবেন এবং সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় আবার ঢাকায় ফিরে আসতে পারবেন।

যাতায়াতের মাধ্যম ও সম্ভাব্য খরচ

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এনা, সৌখিন বা আলম এশিয়া বাস দিয়ে সরাসরি ময়মনসিংহে যাওয়া যায়। এছাড়াও সকালে কমলপুর স্টেশন থেকে তিস্তা এক্সপ্রেস, মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস বা তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনে যাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক।ট্রেনে শোভন চেয়ার ভাড়া ১৫০ – ১৭০ টাকা; স্নিগ্ধা (এসি) ভাড়া ৩০০ – ৩৫০ টাকার মতো। শহরের ভেতরের যাতায়াত; ময়মনসিংহ মাসকান্দা বাস স্ট্যান্ড বা ট্রেন স্টেশনে নেমে রিকশা বা অটোতে চেপে সরাসরি শশী লজ যাওয়া যায়।

খাবারের স্বাদ ও দামকাহন

ময়মনসিংহ শহরে ঘুরতে গিয়ে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ না নিলে ভ্রমণ কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে যাবে!

দুপুরের খাবার: শহরের জিরো পয়েন্ট বা গাঙ্গুলী রোডের সাধারণ হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বেশ ভালো মানের দেশি খাবার পাওয়া যায়। চাল, ডাল, রুই/কাতলা মাছ বা মুরগির মাংসের ঐতিহ্যবাহী প্যাকেজ দুপুরের খাবার পেয়ে যাবেন ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে।

বিকেলের নাস্তা ও মিষ্টি

ময়মনসিংহের বিখ্যাত ‘প্রেস ক্লাব সংলগ্ন কৃষ্ণ কেবিন’ থেকে পরোটা ও বিশেষ ঘুগনি/মালাই দিয়ে নাস্তা সারতে পারেন (খরচ জনপ্রতি ৫০ – ৮০ টাকা)।

ফেরার পথে মুক্তাগাছার বিখ্যাত মিষ্টি ‘মণ্ডা’ কিংবা মা লোকনাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের খাঁটি ছানার মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না। প্রতি কেজি ভালো মানের মণ্ডা বা মিষ্টির দাম পড়বে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা (এক-দুই পিস খেয়ে দেখলে খরচ মাত্র ৩০ – ৫০ টাকা)।

থাকা ও প্রবেশ ফি সম্পর্কিত তথ্য

প্রবেশ ফি: শশী লজ বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত। দেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ টিকিট ২০ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা।

সময়সূচি: রোববার পূর্ণ দিবস এবং সোমবার অর্ধদিবস (দুপুর ২টা পর্যন্ত) শশী লজ বন্ধ থাকে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা (গ্রীষ্মকালে ৬টা) পর্যন্ত খোলা থাকে।

থাকার ব্যবস্থা (যদি থাকতে চান): একদিনে ফিরে আসা সম্ভব হলেও কেউ যদি রাতে থাকতে চান, তবে শহরের ভেতর বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল পাবেন (যেমন: হোটেল সায়ানাইড, হোটেল মুস্তাফিজ, হোটেল সিলভার ক্যাসেল)।

হোটেল ভাড়া: সাধারণ মানের রুম ১,০০০ – ১,৫০০ টাকা এবং এসি বা লাক্সারি রুম ২,৫০০ – ৪,০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।

টিপস: ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পকেটে রাখলেই খুব আনন্দে ও রাজকীয়ভাবে একদিনে শশী লজ ঘুরে আসা সম্ভব!

আমাদের চারপাশের ইটের খাঁচা থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যেতে এবং ইতিহাসের গভীর সান্নিধ্য পেতে ময়মনসিংহের শশী লজ এক অনন্য স্থান। কম বাজেটে ও স্বল্প সময়ে ভ্রমণের জন্য এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে! শত বছর পার হয়ে গেলেও এই প্রাসাদটি এখনও রূপের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুকে ফিসফিস করে বলছে, ‘এসো, দেখে যাও আমার গায়ে জড়িয়ে থাকা এক রাজকীয় অতীত।’

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর