জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রায় সবাইকেই একটি অপ্রিয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তা হলো কারো কাছ থেকে হঠাৎ অসম্মান বা অনাদর পাওয়া। খুব কাছের কেউ, কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী, কিংবা বাসে-রাস্তায় অচেনা একজন মানুষও কখনো কখনো এমন কথা বা আচরণ করে বসেন, যা হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে দেয়।
অসম্মান বা বাজে আচরণের মুখে পড়া মানেই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানানো বা নিজেকে ছোট ভাবা নয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক শান্তি বজায় রেখে কীভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি সামলানো যায়, তা নিয়ে রইল কিছু দরকারি পরামর্শ…
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকুন
কেউ কটূক্তি করলে বা অসম্মানজনক কথা বললে আমাদের প্রথম অনুভূতিই হয় রাগের। মনে হয়, অমনি একটি কড়া জবাব দিয়ে দিই! কিন্তু হুট করে রেগে গিয়ে উত্তর দিলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় এবং অপর পক্ষ আপনাকে আরও দুর্বল ভাবার সুযোগ পায়।
কারো বাজে আচরণের জবাবে অন্তত ১০ সেকেন্ড চুপ থাকুন। একটি গভীর শ্বাস নিন। এই কয়েক সেকেন্ডের নীরবতাই আপনার আত্মসংযমের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আপনার এই নিশ্চুপ থাকা দেখেই সামনের মানুষটি প্রথম ধাক্কাটা খাবে।
কথাকে নিজের ওপর নেবেন না
আমেরিকান লেখক ডন মিগুয়েল রুইজ তার বিখ্যাত বই ‘দ্য ফোর অ্যাগ্রিমেন্টস’-এ বলেছেন ‘কেউ আপনাকে যা বলে বা যা করে, তা মূলত তাদের নিজের ভেতরের মানসিক জগতের প্রতিফলন, আপনার নয়।’
কেউ আপনাকে অসম্মান করল মানেই আপনি ছোট হয়ে গেলেন না। বরং যে ব্যক্তি বাজে ব্যবহার করছেন, তিনি আসলে তার নিজের ব্যক্তিত্ব, মানসিক অস্থিরতা বা পারপাসহীন হিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। কথাটি মন থেকে বিশ্বাস করলে অন্যের কুৎসিত আচরণ আপনাকে সহজে ছুঁতে পারবে না।
সীমানা নির্ধারণ করে দিন শান্ত গলায়
নীরব থাকা মানে কিন্তু অন্যায় সহ্য করা নয়। যদি ঘটনাটি আপনার পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে বারবার ঘটতে থাকে, তবে স্পষ্ট ও শান্ত কণ্ঠে নিজের অবস্থান জানান দিন।
উত্তেজিত না হয়ে সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন – ‘আপনি যেভাবে কথা বলছেন, এই ধরণটি আমার পছন্দ নয়। আমি প্রত্যাশা করি আমরা পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে কথা বলব।’
উচ্চবাচ্য না করে শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে কথা বললে অপরপক্ষ অপরাধবোধে ভুগতে বাধ্য হয়।
‘হাসি’ এবং ‘উপেক্ষা’ আপনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার
অপ্রাসঙ্গিক বা হিংসাত্মক কটূক্তির সেরা জবাব হলো উপেক্ষা। যখন কেউ আপনাকে উসকানি দেওয়ার জন্য কথা বলবে, তখন সেখানে তর্কে না জড়িয়ে সামান্য হেসে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
আপনার নীরব হাসি এবং নির্বিকার ভাব দেখে অপমানকারী বুঝে যাবে যে, তার চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। কারণ যে আপনাকে ছোট করতে এসেছে, তার প্রধান লক্ষ্যই হলো আপনাকে রাগানো। আপনি না রাগলেই তার পরাজয়!
নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও আত্মপর্যালোচনা
কখনো কখনো আবেগের বশবর্তী না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন, সামনের মানুষটির কথায় কি গঠনমূলক কোনো সমালোচনা ছিল? যদি তার বলা কথার ভেতরে সামান্য সত্যতাও থাকে, তবে ক্ষুব্ধ না হয়ে বিষয়টি শুধরে নিন।
আর যদি নিশ্চিত হন যে পুরো আচরণটিই ছিল অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তবে সেই ঘটনাকে মন থেকে চিরতরে মুছে ফেলুন।
ক্ষতিকর মানুষ ও পরিবেশ থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন
যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত আপনাকে ছোট করার চেষ্টা করে, তারা কোনোদিন আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না। এরা আপনার ভেতরের পজিটিভ এনার্জি শুষে নেয়।
এমন মানুষের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করা বন্ধ করুন। যদি এরা আপনার খুব কাছের কেউ হয়, তবে আত্মসম্মানের খাতিরে যোগাযোগ সীমিত করে ফেলুন। নিজের মানসিক সুস্থতা রক্ষার চেয়ে বড় কোনো সামাজিকতা হতে পারে না।
অসম্মান সামলানোর মূল চাবিকাঠি হলো নিজের আত্মবিশ্বাস বা ‘সেফ-ওয়ার্থ’ বজায় রাখা। মনে রাখবেন, নদীর জল ততক্ষণ জাহাজ ডোবাতে পারে না, যতক্ষণ না সেই জল জাহাজের ভেতরে ঢোকে। ঠিক তেমনই, বাইরের কোনো মানুষের কটু কথা আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করতে পারবে না, যতক্ষণ না আপনি নিজে তাকে সেই সুযোগ দিচ্ছেন!
নিজের মতো বাঁচুন, নিজেকে ভালোবাসুন এবং নিজের ইতিবাচক বলয়টিকে শক্ত রাখুন।