Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সংরক্ষিত বনভূমি দখলের অভিযোগ, উচ্ছেদে গিয়ে বাধার মুখে বনবিভাগ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ জুলাই ২০২৬ ১৮:৫৪ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ ২২:৩১

দখলকৃত বনভূমির অংশবিশেষ।

কক্সবাজার: কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশীদনগর ইউনিয়নের কদমর পাড়ায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন মেহেরঘোনা রেঞ্জের কয়েক হেক্টর বনভূমিতে একের পর এক পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের অভিযোগ, বনবিভাগের মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দখল চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সম্প্রতি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। পরে মেহেরঘোনা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হলেও স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে তা পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিন্ডিকেটের হাত ধরে বেপরোয়া দখলদারিত্ব
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেহেরঘোনা রেঞ্জের কদমর পাড়া এলাকায় বদিউল আলম, শামসুল আলমসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বনভূমি দখল করে পাকা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বনবিভাগের কালিরছড়া বিট কর্মকর্তা ও হেডম্যান হাফেজ আহমদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট এ দখলের নেপথ্যে কাজ করছে। কদমর পাড়ায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে সিন্ডিকেটটি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক রোষানল ও ব্যর্থ অভিযান
অভিযানের বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমরা অভিযানে গিয়েছিলাম এবং একটি অবৈধ বাড়ির কিছুটা অংশ গুঁড়িয়ে ভেঙে নষ্ট করে দিয়েছি।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী ভিন্ন দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, ‘রেঞ্জ কর্মকর্তা উচ্ছেদ অভিযান চালাতে এলেও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বাঁধার মুখে কাজ শেষ করতে পারেননি। যে ঘরের সামান্য অংশ ভাঙা হয়েছিল, রেঞ্জ কর্মকর্তা এলাকা ত্যাগ করার পরপরই দখলদাররা তা আবার মেরামত করে নিয়েছে।’

অভিযোগ অস্বীকার ও যোগাযোগে ব্যর্থতা
এদিকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কালিরছড়া বিট কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘বনের জায়গা বিক্রি করে আমি কোনো টাকা নিইনি। যদি হেডম্যান হাফেজ কোনো আর্থিক লেনদেন করে থাকে, তবে সেই দায়ভার সম্পূর্ণ তার, আমার নয়।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত হেডম্যান হাফেজ আহমদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পরিবেশবাদীদের ক্ষোভ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বনভূমি বিনাশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম। তিনি বলেন, ‘আমরা বন ও পরিবেশ রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। অথচ বনবিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তার কারণে আজ আমাদের সমৃদ্ধ বনভূমি উজাড় হতে বসেছে। ঐতিহ্যবাহী বনায়ন ফিরিয়ে আনতে বনবিভাগ দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘সরকারি বনভূমি দখলকারী যে-ই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে আমরা এরইমধ্যে বেশ কিছু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কদমর পাড়ার এই ঘটনায় জড়িত সকলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মেহেরঘোনা রেঞ্জ ও পরিবেশগত গুরুত্ব
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের অধীন প্রধান বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে মেহেরঘোনা রেঞ্জ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল। স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় রেঞ্জটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কদমর পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দখলদারিত্ব চলতে থাকায় বনভূমির একটি বড় অংশ হুমকির মুখে পড়েছে। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত উচ্ছেদ অভিযান ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মেহেরঘোনা রেঞ্জ তার প্রাকৃতিক বনায়নের বড় অংশ হারাতে পারে।

সারাবাংলা/এআর