Sunday 02 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

চকরিয়ায় বনভূমি দখল করে খামার-বাগান নির্মাণের অভিযোগ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৭

কক্সবাজার: কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল গ্রাস করার উৎসব শুরু হয়েছে। সূত্রমতে, স্থানীয় প্রভাবশালী বশির ড্রাইভারের ছেলে মোহাম্মদ আলী লিটনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক চক্র বনের একর একর জমি জবরদখল করে তৈরি করেছে মুরগির খামার, ফল বাগান এবং অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ মাটি ও বালি উত্তোলন। বন বিভাগ ও থানা পুলিশ একাধিক মামলা দায়ের করলেও আইনকে তোয়াক্কা না করে অপরাধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে এই চক্র।

স্থানীয় অধিবাসীদের দেয়া তথ্য ও প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়, খুটাখালী ইউনিয়নের নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা এবং কচুতলিয়া এলাকায় বনের সংরক্ষিত বিশাল জমি জবরদখল করা হয়েছে। এসব জমিতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চারা গাছ কেটে বনভূমি সমতল করা হয়েছে এবং মুরগির খামার ও ফলের বাগান তৈরি করা হয়েছে।
শুধু বনের জমি দখলই নয়, একইসঙ্গে খুটাখালী ছড়া খাল ও বসতভিটা সংলগ্ন এলাকা থেকে দিন-রাতে স্কেভেটর ও ড্রেজার মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ, বসতবাড়ি ও সরকারি বনাঞ্চল।

বিজ্ঞাপন

বন বিভাগ, চকরিয়া থানা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সরকারি নথি পর্যালোচনা করে লিটন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফুলছড়ি বিটের হরিখোলা এলাকায় সংরক্ষিত বনে বেআইনি প্রবেশ, বনের আকৃতি পরিবর্তন করে বালি উত্তোলন ও মাটি পাচারের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন (৩৫) ও তার ভাই মো. ইব্রাহিম (৩২)-এর বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা করা হয়। গোদারপাড়ি এলাকায় জবরদখলের উদ্দেশ্যে বনের জায়গা পরিষ্কার, মাটি কেটে সমতলকরণ ও মুরগির ফার্ম নির্মাণের অভিযোগে লিটন ও ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। একই এলাকায় বনের জায়গা কেটে সমতল করে চাষাবাদের অভিযোগে লিটন, ইব্রাহিম ও ইকবালের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কচুতলিয়া এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কেটে ফল বাগান করে বনের জমি দখলের অভিযোগে লিটন ও জালাল ড্রাইভারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। জঙ্গল খুটাখালী মৌজায় জবরদখলকৃত বরই বাগান সংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে এক আইনজীবীর পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা, বাছুর কুপিয়ে হত্যা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে লিটনসহ ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। তাছাড়া গত ২৪ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে। খুটাখালী ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এলাকাবাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, লিটনের নেতৃত্বে ৮ জনের এক ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট রাত-দিন ড্রেজার ও স্কেভেটর দিয়ে মানুষের বসতভিটা ও খতিয়ানভুক্ত জায়গা থেকে জোরপূর্বক বালি ও মাটি তুলে নিচ্ছে জানা গেছে।

অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপি জানান, লিটন এলাকার ত্রাস হিসাবে সাধারণ মানুষদের আতঙ্কে রেখেছে। তার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত বনের জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা করে আসছে। বনে গরু মহিশ গেলে সেসব ধরে গায়েব করে ফেলে। সম্প্রতি আমার মহিশের দল সেখানে গেলে মহিশের বাচুরকে কোপ মেরে হত্যা করে এবং আরেকটি নিখোঁজ রয়েছে। এই ভূমিদস্যূদের কঠিন শাস্তি হওয়া প্রযোজন অন্যথায় বন হারিয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকবে।

স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় লিটন দীর্ঘদিন ধরে এই দখলদারিত্ব চালিয়ে আসছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে মামলা দেওয়া হলেও বাস্তবিক কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় না। এ ছাড়া অবৈধ দখলের প্রতিবাদ করলে বা বনের দিকে গেলে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি ও শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

এদিকে গত ১৬ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী। আবেদনে জানা যায়, খুটাখালী মৌজার বনবিভাগের আওতাধীন প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে ঘন সালবাগান এবং স্থানীয় কৃষকদের গরু, মহিষ ও ছাগলের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় বশির ড্রাইভার এর ছেলে মুহাম্মদ আলী লিটন এবং খুটাখালী এলাকার মহিদুল ইসলাম, দুজন বনবিভাগের অনুমতি ছাড়াই সালবাগান কেটে কাটা তারের বেড়া দিয়ে অবৈধভাবে ফলের বাগান গড়ে তুলে সরকারি বনভূমি দখল করেন।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, বনের জমি দখল ও বালি উত্তোলনের বিষয়ে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে দায় এড়িয়ে বলেন, ‘তার নামে তো আমরা একাধিক মামলা দায়ের করেছি। মামলা করার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বা কোর্ট কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা আপনারা কোর্টকে গিয়ে জানান।’

সকল অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী লিটন নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে জানান, আমি এসব অপরাধ বা জমি দখলের সাথে কোনোভাবেই জড়িত নই। একটি মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর