Friday 24 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

তিস্তার ভাঙন: একরাতেই নদীগর্ভে বিলীন ১১ পরিবারের বসতভিটা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ জুলাই ২০২৬ ০০:০৩

রংপুর: জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ৩৫ বছরের সংসারে এ নিয়ে অন্তত ১০ বার তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা বিলীন হয়েছে। সর্বশেষ ১০ বছর আগে কাচারীপাড়ায় ঠাঁই নেওয়া এই নারী আবারও নিঃস্ব হয়েছেন। তাঁর চোখের সামনে মুহূর্তেই তিস্তায় তলিয়ে যায় শেষ আশ্রয়টুকু। তিনি বলেন, ‘দশভাঙা দিচু। ৪০ বিঘা মাটি গেইছে। এটে ১০ বছর থাকি খড়কুটা জোগানু, কষ্ট করিয়া বাড়িকোনা বানানু। তাক ভাঙি নদীত গেইছে। আমার জীবন নাই রে ময়না, অসহায় হইনো রে… অ্যালা কোটে যাইম, কি করিম রে’।

তিস্তার পানি বাড়া-কমার এই দুর্যোগে কেবল মোফাজ্জল হোসেন নন, এক রাতের ভাঙনে গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামের অন্তত ১১টি পরিবারের ঘরবাড়ি ও ৫০ একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাড়ির উঠান নেই, ঘরের বারান্দা ঝুলছে নদীর ওপর; কেউ ঘরের টিন খুলে নিচ্ছেন, কেউ ইট-কাঠ সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন

পানি কমলেও বাড়ছে দুর্ভোগ, ভাঙন আরও তীব্র

উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সপ্তমবারের মতো তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) সকাল ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। তবে পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে নদীতীর দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার দুই পাড়ে ২৪২ কিলোমিটার অববাহিকায় অন্তত দেড় শতাধিক স্পটে এবার ভাঙন ধরেছে। বাদ যায়নি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন বাঁধ ও বেড়িবাঁধ।

ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, দুশ্চিন্তায় চাষিরা

পানি বৃদ্ধি ও ভাঙনে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলের এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।

তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণকৃত হেক্টরের পর হেক্টর আমনের আবাদ, বীজতলা ও শাকসবজির খেত। শত শত পুকুর উপচে চলে গেছে মাছ। গঙ্গাচড়া উপজেলায় এবার ৩০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে, এর পুরোটাই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগাম আলু ২৪ হেক্টর ও মিষ্টি কুমড়া ৩৫ হেক্টর ও ধান ১ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে চাষ হলেও পানির তোড়ে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

গংগাচড়া লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামের চাষী মহসীন আলী জানান, সাতবার পানি কমা-বাড়ায় বড় আবাদের ৭০ ভাগই তুলতে পারেননি। বাদামের আবাদ ঘরে তুলতে পারেননি, অর্ধেকের বেশি ভুট্টা পানিতেই তলিয়ে গিয়েছিল। সপ্তমবারের মতো পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সদ্য লাগানো আমনের আবাদ এখন অথৈ পানির নিচে।

ভাঙনে সড়ক-সেতু হুমকিতে, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

ভাঙন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়কে তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে সুরক্ষা বাঁধের কংক্রিট ব্লক ধসে পড়ছে। ইতিমধ্যে বাঁধের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে তিস্তা সড়ক সেতু, মহিপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক এবং আশপাশের ছয়টি গ্রামের মানুষ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের জানান, ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পানির প্রবল স্রোত সুরক্ষা বাঁধে সরাসরি আঘাত হানছে। চোখের সামনে একের পর এক সিসি ব্লক ধসে নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙনের গতিও বাড়ছে। পুরো বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেতু ও সড়ক হুমকিতে পড়বে। আশপাশের গ্রামগুলোও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে’।

এদিকে নোহালী ইউনিয়নের ২, ৭, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া নিয়ে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও ক্ষতিগ্রস্তদের আক্ষেপ

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী ভাঙনের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, ভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে ৪০০ জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে। ২০০৮ সালে প্রায় ১৪ লাখ টাকা খরচ করে ৯ কক্ষের পাকা বাড়ি করা মোতালেব মিয়ার বাড়ি এখন নদীগর্ভে। তিনি বলেন, ‘ওই যে ধপাস করি মাটি ভাঙছে, ওইটা মোর ভিটা না, মোর কলিজা ভাঙছে। শেষ বয়সেও তিস্তা মুক্তি দিল না। ভাঙতে ভাঙতে জীবনটাই কাড়ি নেওছে। এর কি কোনো প্রতিকার নাই?’

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন

তিস্তাপারের মানুষ ভাঙনের স্থায়ী সমাধান চায়। নদীর গভীরতা না থাকায় সামান্য পানিতে বন্যা হয়, যা থেকে স্থায়ী মুক্তি প্রয়োজন। স্থানীয়রা জানান, কাচারীপাড়ার মতো এলাকাগুলোতে এখনো ভাঙন অব্যাহত। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে আরও অনেক বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তিস্তায় বিলীন হয়ে যাবে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, বিষয়গুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে পানি কিছুটা কমলেও উজানের ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবারও অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর